আহারে ক্রিকেট পাগল জাতি

আমরা ক্রিকেট পাগল জাতি। ঠিক আছে। সন্দেহ নাই। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হইলো, ক্রিকেট পাগল জাতির ক্রিকেট সংস্কৃতি বলে কিছু গড়ে উঠে নাই। ১৭ বছর ধইরা টেস্ট খেললেও ক্রিকেট সংস্কৃতির কিছুই গড়ে ওঠে নাই দেশে। এইটা লজ্জাজনক।

কেমন লজ্জাজনক? তার ছোট কিছু উদাহরণ দেয়া যাইতে পারে। যেমন, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ডোমেস্টিক ক্রিকেটের সবচেয়ে ঐতিহ্যপূর্ণ আসর। এই আসরে খেলা দলগুলোও সে হিসেবে ঐতিহ্যপূর্ণ। যেমন মোহামেডান- আবাহনী।

আমি যদি এই দলগুলো সম্পর্কে আমার কানাডার বন্ধুরে কিছু বলতে যাই, সে যদি আমার কাছে এদের ওয়েবসাইটের ঠিকানা চায়, নিজে নিজে জানার জন্য, আমার দেয়ার মতো কিছু নাই। এই দলগুলোতে এক সময় বিশ্ব ক্রিকেটের বড় বড় তারকারা খেলে গেছেন, কবে কোন সালে কে খেলছেন, সেইটা খুঁজতে গেলে আপনারে নানা ঝক্কি পোহাইতে হবে। শেষ পর্যন্ত হয়তো পাবেনই না। উইকিপিডিয়ার পেজেও সকরুণ দারিদ্রের প্রকাশ।

মোহামেডান- আবাহনীরই যেখানে একটা ভার্চুয়াল অস্তিত্ব নাই, বিদেশি বন্ধুর কাছে সহজে তুইলা ধরার মতো পরিচয় নাই, সেইখানে অন্য ক্লাবগুলোর অবস্থা নাই বললাম।

প্রিমিয়ার লিগের সময় দেশজুড়ে উৎসব হওয়া উচিত। এই আসর দিয়েই ভবিষ্যত ক্রিকেট প্রতিভার আগমনি ধ্বনি শোনা যায়। অথচ এমন একটা আসর যে হচ্ছে, তা এক্কেবারে পাঁড়ভক্ত ছাড়া আর কেউ জানে না। কী নিদারুণ অবস্থা বলেন!

আরো একটা বিষয় বলি। প্রিমিয়ার লিগে ব্যাটিংয়ের সময় অনেক ব্যাটসম্যানের প্যাডে দেখি, রঙিন ত্যানা পেঁচানো থাকে। আক্ষরিক অর্থেই ত্যানা। জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানরা তাদের জাতীয় দলের প্যাড পরেন। বয়স ভিত্তিক দলে খেলা খেলোয়াড়দেরও রঙিন, সবুজ প্যাড আছে। কিন্তু অনেকের রঙিন প্যাড নাই। লিস্ট- এতে রঙিন প্যাড পরার জরুরত সারতেই প্যাডে পেঁচাইতে হয় ত্যানা।

এর কারণ ক্লাবগুলো ওই খেলার কয়েকদিনই একটু লাফালাফি করে। তারপর সব হাওয়া। নিজেদের ব্রান্ডের রঙে প্যাড হেলমেট বানানো, জার্সির নতুন নতুন ডিজাইন নিয়ে আসা, দর্শক পর্যায়ে তা বিক্রির উদ্যোগ নেয়া; এ রকম ব্যাপারই নাই। ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে উঠলে, এতিহ্যবাহী শিরোপা জয়ের জন্য ক্লাবগুলোর মধ্যে তাড়না থাকলে, তারা কিন্তু নিজেদের ব্রান্ডিংটাও সেভাবেই করতো। কিন্তু করে না কেনো? তারা কি শিরোপা জিততে চায় না?

চায় তো অবশ্যই। তারপরও এই রকম গরিবি হাল কেনো এই আসরের? এর মূল কারণ, একটু ভালো ইচ্ছার অভাব। প্রিমিয়ার লিগকে যদি বিসিবি ঠিকঠাক আলোয় নিয়ে আসে, দেশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো হামলে পড়বে। জাতীয় দলের মতো উচ্চমূল্যে না হলেও, বহু টাকার স্পন্সর পাবে ক্লাবগুলো। আর টাকা পেলে নিজেদের ব্রান্ডিং করার জন্য তখন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিবে তারা।

দেখা যাবে, প্রত্যেকটা ক্লাবের ওয়েবসাইট তো তখন থাকবেই, থাকবে সংবাদ সরবারহ ও ম্যাচ ফুটেজ সংগ্রহ করার নিজস্ব দলও। ছবি ভিডিও সব ছড়িয়ে পড়বে সব জায়গায়। ওই রকম দিন আসলে, আজ বিকেএসপিতে তামিমের অনন্য অসাধারণ ইনিংসটা দেখতে না পারার জন্য নিশ্চয় আফসোস হতো না কারো। কারণ ক্লাবের ওয়েবসাইট থেকে একটু দেরিতে হলেও দেখে নেয়া যেতো।

আরো কিছু কথা। আবাহনী বা মোহামেডানের লোগোগুলো খেয়াল করছেন? প্রিহিস্টোরিক আমলের। একটা স্পোর্টস ক্লাবের লোগো প্রকাশ করবে উদ্যমতা, আত্মবিশ্বাস এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। আর এদের লোগো দেখলে মনে হয়, কুলখানির ইভেন্ট আয়োজন করে, এরা বোধহয় এমন প্রতিষ্ঠান।

ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক অনেক সাফল্য দরকার, ঠিক আছে। তার আগে সত্যিকারের ক্রিকেট পাগল জাতি হওয়া দরকার। সেটা গ্যালারিতে ভিড় করার মাধ্যমে যতোটা, ততোটা ক্রিকেট সংস্কৃতির ধারক হয়েও।

Leave a Reply