ইচ্ছে

Picture by Akash Mehra
সুপ্তির ইচ্ছেগুলো একদম অন্য রকম। অন্যরকম ওর কথা বলাও। মাঝে মাঝে রনোর মনে হয় সুপ্তির জন্মই হয়েছে অন্যরকমের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে। ওর কিছুই তাই স্বাভাবিক চিন্তায় চলে না। চলে ওর ওই অন্যরকম চিন্তায় ভর দিয়ে। যেমন আগে, সম্পর্কের শুরুতে সুপ্তি হাত ধরে হাঁটতে চাইতো না। এমনকি যখন রনো আর সুপ্তি ছাড়া আশপাশে কেউ নেই তখনো হাত ধরতো না। রনো যদি ধরতে চাইতো, ও ধরতে দিতো না। এ নিয়ে কতোবার যে রনো মন খারাপ করছে তার হিসেব নেই। সুপ্তির সাথে জীবনের লম্বা একটা সময় কাটিয়ে দেওয়ার পর ও সব সয়ে নিয়েছে। সুপ্তির মতো ও নিজেও এখন সহজভাবে চিন্তা করতে পারে না। সহজভাবে, মানে স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারে না। কিছুটা অন্যরকমভাবে ওর কাছে ধরা দেয় পৃথিবীটা।

শুরুতে সুপ্তির নামটাই প্রথম অন্যরকম লেগেছিলো রনোর কাছে। বান্ধবীরা সুপ্তিকে সুপ্তি সুপ্তি বলে ডাকতো, আর রনো চিন্তা করতো এইটা আবার কেমন নাম রে বাবা! সুপ্‌তি! কোনো নাম হলো নাকি? রনোর খুব ইচ্ছে ছিলো সুপ্তির সাথে কথা বলার সুযোগ হলে ওর নামটা আসলে কী তা জানতে চাইবে। কিন্তু এই ইচ্ছেটা রনো সযত্নে এড়িয়ে গেছে। সুপ্তির সাথে প্রথম কথা বলার বহু দিন পর ওর নাম নিয়ে কথা বলেছে রনো। কারণও ছিলো। রনো মনে করে ওর নিজের নামটাই কেমন যেনো। এ নাম নিয়ে আবার অন্য কারো নামকে খাটো করা যায় না কি! এসব ভেবে রনোর তখন মন খারাপ হতো। কিন্তু পরে সুপ্তির পুরো নাম জেনে সে মন খারাপ দূর হয়েছে রনোর। দূর হয়েছে সে সব প্রশ্নও, যা নিজের নাম নিয়ে ওর মনে তৈরি হয়েছিলো।
ইট কাঠের শহরে বিকেল কাটানোর জায়গা নেই। খেলার মাঠগুলো ভরাট করে গজিয়ে উঠছে দালান কোঠা। এরপরও কিছু জায়গা এখন পর্যন্ত টিকে আছে। বাড়ির পাশে এমনই জায়গায় প্রতিদিন বিকেল কাটায় সুপ্তি। ওর বিকেল কাটানোর জায়গায়-ই রনো খেলে ক্রিকেট। সেটাও ওই বিকেল কাটানোর জন্যই। শহরের পাশাপাশি বাড়িতে থাকলেও কেউ কাউকে চিনে না। একই জায়গায় বিকেল কাটিয়েও তাই চেনা জানা হয় না সুপ্তি ও রনোর।
পারস্পরিক চেনা জানা না হলেও অন্যরকম সুপ্তির চোখে ঠিকই পড়ে রনোকে। অন্যরকম বলেই বান্ধবীরা যখন বিকেল কাটানোর সময়ে সারাদিনের গালগল্প আর সন্ধ্যার পরের টিভি সিরিয়াল নিয়ে আড্ডা জমায়। সুপ্তি তখন দেখে ক্রিকেট খেলা। মেয়েরা আগে ক্রিকেটের খোঁজ খবর রাখতো না। এখন রাখে। যারা রাখে তাদের মধ্যে চোখ বন্ধ করে ভালো করে যারা জানে, তাদের তালিকায় রাখা যাবে সুপ্তিকে। ইচ্ছে করলে ওকে বিশেষজ্ঞ বলেও সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া যায়। কদিন আগেই পাড়ার এক বড় ভাইকে ও বুঝিয়েছে টেস্ট ক্রিকেটে ফলোঅন কিভাবে হয়। টেস্টে একই দলকে পরপর দুবার ব্যাটিং করতে দেখে ওই বড় ভাইয়ের মনে প্রশ্নে জেগছিলো।
রনো সুপ্তির চোখে পড়ে ক্রিকেট খেলতে খেলতেই। এটা অবশ্য রনো জানতো না। জেনেছে অনেক দিন পর। ব্যাংক টাউনের বিকেল কাটানোর মাঠটা ছেড়ে যখন অনেক দূরে থাকছে ওরা, তখনই এক বিকেলে সুপ্তি ওকে বলেছে। সুপ্তি আসলেই অন্যরকম। না হলে এই প্রথম ভালো লাগার শুরুর কথা মানুষ এতোদিন না বলে থাকে? থাকা যায় নাকি!
এসব ভাবতে ভাবতে রনোর ঘুম ঘুম লাগে। কিন্তু ও ঘুমাতে পারে না। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর সাথে থাকা মানুষগুলোর জন্য ঘুমানোর কোনো ব্যবস্থা থাকে না। ব্যবস্থা করে নিতে হয়। ফ্লোরেই ঘুমাতে চায় রনো। কিন্তু ওকে ফ্লোরিং করতে দেয় না সুপ্তি। ফ্লোরে শুতে গেলেই রেগে যায় সে। দিনের বেলায় শত ঘুম ধরলেও তাই ঘুমানোর কোনো সুযোগ নেই রনোর। রাতে সুপ্তির সাথেই ঘুমায়। দিনের বেলাও চাইলে সুপ্তির সাথে ও ঘুমাতে পারে। কিন্তু যখন তখন ডাক্তার এসে সুপ্তির খোঁজ নেয়।
একদিন নতুন পাশ করা এক মেয়ে এসেছে সুপ্তিকে দেখতে। রনো তখন সুপ্তির সাথেই শুয়ে ছিলো। নতুন ডাক্তার চোখ কুচকে রনোর দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, বাসায় গিয়ে ঘুমান। রোগির তো নড়তে কষ্ট হয়। ওই ঘটনায় খুব লজ্জা পেয়েছিলো রনো। তারপর থেকে দিনের বেলায় সুপ্তির বেডে শোয় না ও। পাশে চুপ করে বসে থাকে, অথবা সুপ্তি জেগে থাকলে দুজনে কথা বলে।
ঘুম ঘুম ভাবটা কাটে না রনোর। বারান্দা থেকে রুমে ঢুকে ও। সুপ্তির ঘুম ভেঙে গেছে। গোলাপি রঙের টেবিল ল্যাম্পের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুপ্তি। সরকারি হাসপাতালে টেবিল ল্যাম্প থাকে না। এখানেও ছিলো না। কিন্তু আনা হয়েছে সুপ্তির কারণে। গোলাপ রঙের এই টেবিল ল্যাম্পটার দিকে তাকিয়ে না থাকলে ঘুম আসে না ওর। অন্যরকম এই অভ্যেসটা সেই ছোটবেলা থেকেই। সুপ্তির মা রনোকে প্রায়ই বলেন, বাবার কারণেই এমন অদ্ভুত সব অভ্যেস হয়েছে মেয়েটার। রনো কোনো উত্তর দেয় না। হা হু করে কথা শেষ করে সুপ্তির মার সাথে। সুপ্তির এই অভ্যেসটা ভালোই লাগে রনোর। রনোর অবশ্য সুপ্তির সবই ভালো লাগে।
রনোর রুমে ঢোকা টের পায় সুপ্তি। কিন্তু কিছু বলে না। টেবিল ল্যাম্প থেকে দৃষ্টিও সরায় না। রনোই কথা বলে বলে আগে, ঘুম ভাঙছে কখন? সুপ্তি আস্তে করে তাকায়। বলে, এই তো কিছুক্ষণ হয়। সুপ্তির চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। আগে কোনোদিন এমন হয়নি। এবার হয়েছে। রনোর খুব খারাপ লাগে। কিন্তু ওর কিছু করার নেই। খুব খারাপ লাগার মতো হাজার মুহূর্ত আসে প্রতিদিন। কিন্তু রনোর কিছু করার থাকে না। সুপ্তির পুরো সুস্থ হতে কতোদিন লাগবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। ডাক্তার বলেছে, আরো অন্তত দেড় মাস লাগবে। সুপ্তি চেয়েছিলো বাড়ি চলে যেতে। কিন্তু রনোই না করেছে। বাড়িতে গেলে হাসপাতালের মতো সেবাযত্ন হবে না।
ল্যাম্পের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকায় সুপ্তির চোখের কোণে পানি জমেছে। রনো সুপ্তির পাশে বসে। আলতো করে চোখে ছুঁয়ে পানি মুছে দেয়। সাথে সাথে বলে, চশমা ছাড়া কি ল্যাম্প দেখা যায়? এই ল্যাম্প দেখতে দেখতেই চশমা ঝুলিয়েছো চোখে। সুপ্তি ঠোঁট চেপে হাসে। সুপ্তির ঠোঁট দুটো শুকিয়ে গেছে। শুকনো ঠোঁটে সুপ্তির হাসি অন্য রকম লাগে রনোর কাছে। সুপ্তি বলে, চশমা ছাড়াই ভালো দেখি। আমার তো ল্যাম্পের নিচে পড়ে থাকা পোকা মাকড় দেখতে হয় না। গোলাপী আলোটা দেখলেই হয়। রনো শব্দ করে হেসে উঠে। বলে, এই হাসপাতালের এক ও একমাত্র রোগি তুমি। যার প্রতিটি শখ আহ্লাদ এখানে পূরণ করা হচ্ছে। সুপ্তি উত্তর দেয় না। রনোকে জিজ্ঞেস করে কটা বাজে। রনো জানায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ফুসকা খাওয়ার আবদার করে সুপ্তি। তাও আবার নিজে বাইরে গিয়ে। নিয়ে আসলে হবে না! রনোর মনটা নড়ে উঠে। বুক ফেটে কান্না আসে ওর। সুপ্তিকে ও তা বুঝতে দেয় না। বলে, সোনা, আর কয়েকটা দিন দেরি করো। তারপর আমরা আবার সন্ধ্যার পর ফুসকা খাবো। চটপটি খাবো। একসাথে হাত ধরে হাঁটবো। সুপ্তি আস্তে করে বলে, ঠিক আছে।
রনোর ইচ্ছে ছিলো না। সুপ্তির পাগলামিতেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলো ও। তারপরই এসেছে এমন বিপদ। প্রথম সন্তান প্রসব করতে গিয়ে জীবনে নেমে এসেছে এমন দুর্বিসহ দিন। প্রসবের সময়ের আগে থেকেই প্রচণ্ড রকম ভয় গ্রাস করে সুপ্তিকে। মানসিকভাবে ভেঙেই পড়ে ও। তার প্রভাব পড়ে শরীরেও। পরে প্রসবের সময় ব্যথার তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সুপ্তি। জন্ম দেয় মৃত সন্তান। ঘটনার আকস্মিকতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে রনোও। মৃত সন্তান বিষয়ে কিছু করার ছিলো না ওর। আল্লাহর ইচ্ছা বলে মেনে নিয়েছে। কিন্তু স্ত্রীর জ্ঞান না ফেরা আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলো রনো। টানা তিন দিন পর জ্ঞান ফিরে সুপ্তির। রনো তখন ওর সামনে ছিলো না। কেউ একজন তখনই ওর কানে দিয়েছিলো মৃত সন্তানের খবর। সাথে সাথে আবার জ্ঞান হারায় সুপ্তি। আবারও টানা তিন দিন পর্যন্ত জ্ঞান ফিরে না পেয়ে মৃতপ্রায় হয়ে যায় সুপ্তি। জীবনের সবচেয়ে কঠিন ওই সময়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য্য ধরেছিলো রনো। দিন রাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলো সুপ্তির সুস্থতার জন্য।
ঘটনার দশ দিনের মাথায় সুপ্তিকে নিয়ে বাসায় ফিরে রনো। ফিরেই আবার জ্বরে পড়ে সুপ্তি। চব্বিশ ঘণ্টা জ্বরের তাপমাত্রা থাকে শ ছাড়িয়ে। রনো বুঝতে পারে না কী করবে। অফিস থেকে বারবার ছুটি নিতে নিতে চাকরি যায় যায় অবস্থা। সাথে স্ত্রীর সুস্থ না হওয়া। দুচোখে অন্ধকার নেমে আসে রনোর। আবার সুপ্তিকে নিয়ে আসে হাসপাতালে। তিন দিনের মাথায় জ্বর কমতে শুরু করে সুপ্তির। কিন্তু দেখা দেয় আরেক বিপদ। একটা পা নড়াতে পারে না সুপ্তি। প্রথমবার সুপ্তির কাছে পা নড়াতে না পারার কথা শুনে হাউমাউ করে কেদে উঠে রনো। ওর কান্না শুনে ছুটে আসেন ডাক্তাররা। নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর ডাক্তার জানায়, তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী হয়েছে। পুরো পৃথিবীটাই যেনো পাহাড় হয়ে চেপে বসে রনোর মাথায়। এমন অনিশ্চিয়তায় কাটে পুরো দুসপ্তাহ। তারপর ডাক্তাররা জানান, পা নড়াতে পারবে সুপ্তি। কিছু দিন সময় লাগবে। তারপর থেকেই চলছে ক্ষণগণনা।
সুপ্তিকে চটপটি খাওয়াতে না নিয়ে যেতে পারায় খুব কষ্ট হয় রনোর। কিন্তু ধৈর্য ধরা ছাড়া কিছু করার থাকে না ওর।
সন্ধ্যার পরপর সুপ্তির জন্য হাসপাতালের খাবার সরবারহ করা হয়। বাইরের কিছু খেতে মানা। রনো সুপ্তিকে জিজ্ঞেস করে এখনই খাবে কি না। সুপ্তি বলে, খাবো। কিন্তু একা খাবো না। তোমারও খেতে হবে আমার সাথে। রনো বলে, এই খাবারে দুজন খেতে পারবো না। তুমি খাও আমি পরে খাবো। সুপ্তি না করে। বলে খাবার নিয়ে আসতে। রনো কিছু বলে না। সুপ্তির এমন ছোট ছোট আবদার পূরণ করতে ওর খুব ভালো লাগে। সুপ্তি তো এমনই পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট আবদারটা করবে। পূরণ না করলে এতোটাই রেগে বসবে যে, সে রাগ ভাঙাতে গিয়ে গায়ে জ্বর উঠে যাবে রনোর।
রনো খাবার আনতে যায়। যাওয়ার পথে ফোন করেন দেওয়ান স্যার। রনোর বস। বস হলেও দেওয়ান সাহেব রনো বলে দিয়েছেন, ও যাতে কখনোই স্যার না বলে তাকে। ভাইয়া বলে ডাকতে বলেছেন। এখনো চল্লিশ বছর বয়স না হওয়া লোককে ভাইয়া বলতে দ্বিধা নেই রনোর। ও তাই দেওয়ান সাহেবকে ভাইয়া বলেই ডাকে। এই দেওয়ান সাহেবের কারণেই চাকরিটা যায়নি রনোর। দেওয়ান সাহেব না থাকলে নির্ঘাত চাকরি হারাতে হতো রনোকে। দেওয়ান সাহেবের প্রতি তাই রনোর অশেষ কৃতজ্ঞতা।
রনো বুঝতে পারে না হঠাত সন্ধ্যায় কেনো ফোন দিলেন তিনি। রনো ফোন ধরে। দেওয়ান সাহেব বলেন, সুপ্তির কী অবস্থা আফরোজ? রনো উত্তর দেয়, আগের চেয়ে ভালো ভাইয়া। পা এখন একটু একটু নাড়াতে পারছে। ডাক্তার বলেছে মাস দেড়েকের মধ্যেই পুরো সুস্থ হয়ে যাবে। আলহামদুলিল্লাহ বল শুকরিয়া জানান দেওয়ান সাহেবলোকটাকে কখনো নামাজ পড়তে দেখেনি রনো। কিন্তু কথায় কথায় আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ, ফি আমানিল্লাহ এসব বলতে দেখে সব সময়। দেওয়ান সাহেবকে রনোর খুবই ভালো লাগে। দেওয়ান সাহেব বলেন, আফরোজ, আগামীকাল একবার অফিসে এসো। জরুরী দরকার। রনো বুঝে না, কী দরকার তা জিজ্ঞেস করা উচিত হবে কি না। রনো চুপ করে থাকে। দেওয়ান সাহেবই বলে উঠেন, তোমার গত মাসের স্যালারিটা নিয়ে যেয়ো। রনোর খুব ইচ্ছে করে ধন্যবাদ দিতে। কিন্তু ও দিতে পারে না। শুধু বলে, ঠিক আছে ভাইয়া। দেওয়ান সাহেব ফোন রেখে দেন। দেওয়ান সাহেবের প্রতি রনোর কৃতজ্ঞতা বেড়ে যায় আরো। অফিস থেকে রনো পে-অফ ছুটি চেয়েছিলো। কিন্তু দেওয়ান সাহেবের কারণে পে অফ থাকলো না।
দেওয়ান সাহেব রনোকে আফরোজ বলে ডাকেন। আফরোজ রনোরই নাম। রনোর পুরো নাম রওনক আফরোজ। রনো ওর ডাকনাম। সুপ্তি রনোর পুরো নামটা জেনেছে অনেক দিন পর। প্রথম সরাসরি কথা বলার প্রায় এক বছর পর।
ওদের প্রথম কথা বলার সুযোগটা এসেছিলো একেবার অন্যভাবে।
একদিন বিকেল চারটা। সবেমাত্র কলেজ থেকে ফিরেছে সুপ্তি। বাসায় ঢুকে দেখে কেউ নেই। মাকে ফোন করে ও। ফোন বন্ধ। বাবাকে ফোন করে। তার ফোনও বন্ধ। চমকে উঠে সুপ্তি। পাশের বাসার এক আন্টি জানায় সুপ্তির বাবা হঠাত অফিসে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে অফিস থেকে ফোন করে ওর মাকে ডেকে নিয়েছে। যাওয়ার সময় ওর মা বলে গিয়েছে তার ফোনে চার্জ নেই। বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সুপ্তি যাতে কলেজ থেকে এসেই ল্যাব এইডে চলে যায়। জেনেই সুপ্তি প্রায় দৌড়ে তিন তলা থেকে নেমে আসে। খেলার মাঠটা পেরিয়ে রিকশা ডাকে। ইকবাল রোড থেকে ল্যাব এইডের দূরত্ব পঁচিশ টাকার রিক্শা ভাড়া। কিন্তু একটা রিকশাও যেতে চাচ্ছে না। সারা দুপুর রিক্শা চালিয়ে ক্লান্ত রিকশাওয়ালারা নড়তেই চাইছে না।
তখনই মাঠে আসে রনো। রিকশাওয়ালার সাথে সুপ্তি চেঁচামেচি দেখে এগিয়ে গিয়ে সব শুনে। কথা না বাড়িয়ে নিজের বাইকে উঠতে বলে সুপ্তিকে। সুপ্তি কিছু না ভেবে চড়ে বসে। হাসাপাতালে গিয়ে দেখে বাবা-মা এক সাথে বের হয়ে আসছেন। প্রচন্ড গরমে হিট স্টোক হয়েছিলো সুপ্তির বাবার।
সেদিনই প্রথম কথা হয় ওদের। বাইকে চড়ে ল্যাব এইড যেতে। সুপ্তি বলেছিলো, আপনি তো বিকেলে ওই মাঠে ক্রিকেট খেলেন, তাই না? মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলো রনো। এই-ই প্রথম কথা। তারপর থেকে হাই হ্যালো চলতো নিয়মিত। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব। তারপর বন্ধুত্বের সিঁড়ি বেয়ে ভালোবাসা। তারপরের গল্পগুলো তো সবাই বুঝে!
বিয়ের মাস ছয়েক আগে, দুবছর প্রেম করার পর রনো একদিন জিজ্ঞেস করে সুপ্তির পুরো নাম কী! সুপ্তি চোখ বড় বড় করে তাকায়। বলে, তোমার পুরো নাম আগে বলো! র- ন! এটা আবার কেমন নাম? রনো প্রায় কথা ভুলে যায়। যে ভয়ে এতোদিন সুপ্তির নাম জিজ্ঞেস করেনি, সুপ্তি সে ভয়টাকেও সত্য করে ছাড়লো! রনো বলে, না তোমার নাম আগে বলো। সুপ্তি মানে না। রনোকেই আগে বলতে বলে। রনো তখন বুঝে গেছে সুপ্তির সাথে তর্ক করা বৃথা। সুপ্তির ছোট আবদারগুলো পূরণ করাই ওর কাজ। রনো ওর পুরো নামটা বলে। রওনক আফরোজ। সাথে বলে, রনো আমার ডাক নাম। সুপ্তি বলে, সুপ্তিকা। আমার নাম সুপ্তিকা। পুরোটা বলতে বলে রনো। সুপ্তিকা বলে, কেনো এইটুকু পছন্দ হয় না। রনো মজা করে। বলে, তোমার নাম না থাকলেও তো তোমাকেই আমার পছন্দ হয়। দুজনই শব্দ করে হাসে। হাসতে হাসতে সুপ্তি বলে ওর পুরো নাম। ফারহানা তানহা সুপ্তিকা।
পনের মিনিটের মধ্যেই খাবার নিয়ে আসে রনো। প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে রুমে ঢুকে ও। সুপ্তি ধমকে উঠে, বলেছি না সিঁড়িতে দৌড়াবা না। আর কতোবার বললে তুমি ঠিক হবা? রনো কিছু বলে না। হাত ধুয়ে খাবার দু প্লেটে নিয়ে বসে ও। সুপ্তির শাসন চলতেই থাকে। রনো বলে, আচ্ছা ঠিক আছে। সিঁড়িতে দৌড়াবো না। বলতে বলতে খাবার তুলে দেয় সুপ্তির মুখে।
সুপ্তি অসুস্থ বলে নয়, সব সময়ই খাবার খাইয়ে দেয় রনো। অন্য সময় এক প্লেটেই খাবার খায় ওরা। কিন্তু এখন দুজনের দুরকম খাবার। তাই দু প্লেটেই খেতে হচ্ছে। সুপ্তি এক প্লেটে আগে খেতো বাবার সাথে। বিয়ের পর রনোর সাথে। সুপ্তির মা প্রায়ই রনোকে বলেন, বাবার আহ্লাদেই মেয়েটার এ অবস্থা হয়েছে। রনো কিছু বলে না। শুধু হাসে। রনোর হাসি দেখে সুপ্তির মা বুঝে নেন, সুপ্তিকে নিয়ে সুখেই আছে রনো। তার চিন্তা লাগে না কোনো।
রনো একবার সুপ্তির মুখে খাবার তুলে দেয়। একবার নিজে খায়। মাঝে মাঝে সুপ্তিও রনোর মুখে লুকমা তুলে দেয়। এরমধ্যেই দিনের শেষবার সুপ্তিকে দেখতে আসে ডাক্তার। আজ আবার সেই নতুন ডাক্তারটা এসেছে। সে এসেই দেখে সুপ্তি খাবার তুলে দিচ্ছে রনোর মুখে। নতুন ডাক্তার হেসে উঠেন। বলেন, আপনাদের এই খাওয়ার দৃশ্য তো হাসপাতালের সব রোগিদের লাইভ দেখানো উচিত! সবাই অর্ধেক সুস্থ হয়ে উঠবে। লজ্জায় লাল হয়ে যায় রনো। ডাক্তার চলে যায়। যেতে যেতে বলে খাওয়া শেষ করুন। আমি একটু পর আসছি।
একটু পর ডাক্তার এসে সারাদিনের খোঁজ নেয়। ওষুধ ঠিক মতো খাওয়া হয়েছে কিনা জানতে চায়। যাওয়ার আগে সুপ্তিকে বলে পা নাড়িয়ে দেখাতে। সুপ্তি নাড়ায়। আগের চেয়ে বেশ উন্নতি হয়েছে। সুপ্তি নিজেই তা বুঝতে পারেপাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখে রনো।
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর রনো সুপ্তির মাথায় তেল দিয়ে দেয়। অনেকগুলো রাত ধরে ঘুমাতে পারছে না ও। রনো নিজের কষ্টটা মেনে নিতে পারে মুহূর্তেই। কিন্তু সুপ্তির কঠিন দিনগুলো সহজে মেনে নিতে পারে না। অন্যরকম এই মেয়েটাকে ও যে কতোটা পাগলের মতো ভালোবাসে, রনো নিজেই তা জানে না।
সুপ্তির চুলে হাত বোলাতে বোলাতে রনোর সেই আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। সুপ্তি হাত ধরতে চাই তো না। রনো মজা করে বলতো, প্রথম কথা বলার সময় তো কোমড়ই ধরেছিলে, এখন হাত ধরো না কেনো! সুপ্তি শুধু হাসতো। কথা বলতো না। হাতও ধরতো না। কিন্তু পরে, বিয়ের পর বদলে গেলো সুপ্তি। পাশাপাশি হাঁটলে তখন হাত ধরতেই হবে ওর। এমনকি নিউ মার্কেটের ভিরের ওভার ব্রিজ পার হতেও ছাড়া যায় না ওর হাত। রনো তবুও কোনোদিন একটা মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত হয় না।
রনো খেয়াল করে সুপ্তি ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত সুপ্তিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। রনো অপলক তাকিয়ে থাকে। রনো তাকিয়ে থাকে সুপ্তির মুখের দিকে। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় তৈরি হয়ে এক অপার্থিব দৃশ্য।

একটা সময় রনোরও ঘুম পায়। সুপ্তির পাশে শুয়ে পড়ে ও।

Leave a Reply