তোমার জন্য লেখা

গুলশান, ঢাকা

নিউ সাউথ ওয়েলসে যখন- তখন বৃষ্টি নেমে আসে, তাই না? আমি সেখানে যাইনি কখনো। তারপরও আবহাওয়ার খবরটা পেয়ে যাই। গুগলে সার্চ দিলেই হয়। বুঝতে পারি তুমি কেমন থাকো। তুমি মানে আমার সীমাহীন স্মৃতিকাতরতা।

কদিন ধরে বৃষ্টির এমন হঠাৎ চলে আসা চলছে ঢাকাতেও। আজই যেমন। সকালে দেখলাম কটকটে রোদ। আজকাল খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়ি। আজও তাই উঠেছিলাম। কিন্তু বাইরে বের হতে হতে বেজে গেছে দুপুর বারোটা। লম্বা একটা সময় বসে ছিলাম লেখার টেবিলে।

আমি যে ঘরটাতে থাকি, সেটা চার তলায়। নিউ সাউথ ওয়েলসে তোমার বাড়িটা কয় তলার? তুমি কোনটায় থাকো? চার তলায় কি? সেটা হলে কিন্তু ভালোই হয়! আমি- তুমি সমান্তরাল!

যা হোক, আমার ঘরের কথা বলছিলাম। পান্থপথের সাততলা বাড়িটার চারতলায় আমি থাকি। বড় একটা ফ্ল্যাট। এই ফ্ল্যাটের একটা ঘর আমার। আলো-বাতাসের চলাচল নেই বললেই চলে। বাইরে বৃষ্টি দূরে থাক, প্রচণ্ড ঝড় হলেও মাঝে মাঝে টের পাই না!

বেলা বারোটায় ঘর থেকে বের হওয়ার আজ দেখলাম খুব রোদ। এক প্যাকেট অলিম্পিক নাটি আর দশ টাকা দামের দুটি নেসক্যাফে নিয়ে ঘরে ফেরার পর আমার বসেছিলাম লেখার টেবিলে। টানা লেখে গেছি কিছুক্ষণ। কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগাড়ি। কিছুক্ষণ বই-টই পড়েছি।

বিকেল চারটার দিকে বের হলাম আবার। উদ্দেশ্য অফিস। আমার অফিসটা গুলশানে। বাসা থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে। আমি হাতিরঝিল দিয়ে অফিসে আসি। আচ্ছা, নিউ সাউথ ওয়েলসে ডানা মেলার আগে তুমি কি হাতিরঝিল দেখে গেছো? দারুণ সুন্দর একটা জায়গা। আবার ঢাকা এলে দেখে যেতে পারো।

বলছিলাম বৃষ্টির কথা। অফিসে আসার পথে দেখলাম পৃথিবীটা কেমন মুখ গোমড়া করে আছে। জানো, মানুষ যেখানে থাকে, তার কাছে মনে হয় সেটাই পুরো পৃথিবী।

মেঘলা আকাশ, ভ্যাপসা গরম বাতাস দেখে আমার মনে হয়েছিলো পুরো পৃথিবীর বিকেল চারটাই এক রকম। যেনো এখনই নামবে বৃষ্টি। এখনই নামবে বৃষ্টি- বলে হাবিবের একটা গান আছে, তাই না? তুমি তো হাবিবের ভক্ত ছিলে। আমি কিছুদিন হাবিবের গান লেখার জন্য ঘুরেছি। পারিনি। পারিনি মানে লিখতে পারিনি নয়, হাবিবকে ধরতে পারিনি। কোনো দিন পারবো হয়তো। হয়তো উনি আমার গানও গাইবেন। তুমি নিশ্চয় খুশি হবে, তাই না? উহ হো, তুমি জানতেই পারবে না!

যা হোক, অফিসে আসার পথে মুখ গোমড়া করা আকাশটা কেঁদে দিলো সন্ধ্যা নাগাদ। চৈত্র মাসে এতো বৃষ্টি হচ্ছে আজকাল, অবাক লাগে। নিউ সাউথ ওয়েলসের বৃষ্টি কি এ রকম অবাক-টবাক করে তোমাকে? করার কথা নয়। কারণ বৃষ্টি তো ওইখানে প্রায় প্রতিদিনই আসে। তুমি নিশ্চয় অভ্যস্ত হয়ে গেছো।

কিন্তু আমি একটা ব্যাপারে আজও অভ্যস্ত হতে পারলাম না। তুমি কাছাকাছি নেই, কতো দিন হয়ে গেলো। কিন্তু আমি তোমার ঘ্রাণ এখনো পাই। মনে হয় না তুমি নাই। মনেই হয় না তুমি আর থাকবে না।
তুমি তো রবীন্দ্র সঙ্গীত খুব শুনতে এক সময়। এখন কি শোনো?

‘যারে এতো ভালোবাসি,
এতো যারে চাই,
মনে হয় না তো, সে যে কাছে নাই…’

এই গানটা শুনেছে নিশ্চয়। কখনো কি বুঝেছো, কী বলা হচ্ছে? হয়তো বুঝেছো, হয়তো বুঝোনি। আমি কিন্তু বুঝেছি। বুঝেছি ঠিক নয়, এখন বুঝতে পারছি।

নয় হাজার কিলোমিটার দূরের একটা জায়গার মতো এখানেও যখন- তখন বৃষ্টি নামছে আর তোমাকে মনে পড়ার পুরোনো রোগটা আমার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে প্রতি মুহূর্তে। পৃথিবীর দুইটা প্রান্তের আবহাওয়ায় কতো মিল। তোমার- আমার মনের আবহাওয়াও কি কখনো মিলে যাচ্ছে?

Leave a Reply