নোভার ফিরে আসা

পান্থপথ, ঢাকা
বিষয়টিকে নেহায়েত কাকতাল বলে এড়িয়ে যেতে পারছি না। নোভার চলে যাওয়ার পর গত সতের বছরে একবারও আমি সায়েদাবাদ আসিনি। এ দিকে অবশ্য আমার কখনো কাজও থাকে না। নোভা চলে গেছে বলেই যে আমি এদিকে আসিনি, ব্যাপারটা সে রকমও নয়। প্রয়োজন পড়েনি বলেই আমার সায়েদাবাদ আসা হয়নি।

সতের বছর পর আবার যখন সায়েদাবাদে আমার পা পড়লো, নোভার স্মৃতি তখন অবধারিতভাবেই আমার মানসপটে ভেসে উঠছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে আমার জন্য অপেক্ষা করছে ও। আমি প্রায় বোকার মতো গাড়ির কলকব্জা ঠিক করা একটা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টির দিনে বৃষ্টিতে না ভিজলেও ওর ঠাণ্ডা লেগে থাকে। এটা আমার অজানা নয়। এই মুহূর্তে আমার উচিত নিজে ভিজে হলেও নোভাকে ভিজতে না দেয়া। ঠিক সতের বছর আগে, যখন ওর সাথে আমার শেষ দেখা হয়, ঠিক তখন এমনই ছিলো মুহূর্তেরা। ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ওর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন একটুও বুঝতে পারিনি, নোভার কাছাকাছি দাঁড়ানোর সুযোগ আমার আর হবে না।

সতের বছর পর ঠিক ওই স্মৃতিটাই কেনো মনে পড়ছে বুঝলাম না। নোভার সাথে তো আমার বহু স্মৃতি। বহু মানে অগণন। প্রথমবার ওর হাত ছোঁয়া। প্রথমবার ওর শ্বাসের ঘ্রাণ নেয়া। সাড়ে চার বছরের সবই তো আমার স্পষ্ট মনে আছে। তাও কেবল ওই শেষ দিনের স্মৃতিটা কেনো পড়ছে কে জানে। মানুষের মনোজাগতিক ব্যাপার-স্যাপার বড় অদ্ভুত। তার চেয়েও কম অদ্ভুত নয় প্রকৃতির খেয়াল।

আজ আবার হঠাৎ করেই সেই রকম ঝুম বৃষ্টি। কতো দিন যে এভাবে এতো কাছে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখিনি! আজ ও সতের বছর আগের বৃষ্টির মধ্যে কতো মিল। অথচ দীর্ঘ এই সময়ে পৃথিবীটা কতো বদলে গেছে। আমার বয়স বেড়ে চল্লিশের কাছাকাছি চলে এসেছে। চোখে উঠেছে মোটা ফ্রেমের চশমা। ফ্রেমের সাথে পাল্লা দিয়ে মোটা হয়েছে চশমার কাঁচও। কেবল বদলায়নি বৃষ্টি পতনের দৃশ্য। বদলায়নি বৃষ্টির অপার্থিক ক্ষমতা। সতের বছর আগের স্মৃতি ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠছে।

চট্টগ্রাম থেকে আসা বাস যেখানে থামে, তার কাছেই গাড়ির টায়ারের একটা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার সাথেও বেশ কয়েকজন আছে। এখানে সবার জড়ো হওয়ার একটাই কারণ- বৃষ্টি থেকে বাঁচা। বৃষ্টির ফোঁটা ক্রমশ বড় হয়ে আসছে। ছাউনির অনেকটা ভিতরে, প্রায় দোকানের মহাজনের বসার চেয়ারের কাছে ঢুকে গেছি আমরা। বৃষ্টির ছাঁট তবু প্যান্টের নিচের দিকটা ময়লা করে দিচ্ছে। আমাদের ছাউনিটার ঠিক সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ছাতা নেই। রেইনকোটও নেই। দুই হাতে দুই সাইজের ব্যাগ। একটা ভ্যানিটি। আরেকটা ট্রাভেল।

একবার সে পিছনে ঘুরে তাকালো। সাথে সাথে ছাউনির শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো মধ্য বয়সী লোকটা একটু ভিতরে চেপে দাঁড়ালো। তার এই চেপে আসা আসলে মেয়েটিকে ভিতরে আসতে বলা। মেয়েটি কিন্তু এলো না। একবার দেখেই মুখ ঘুরিয়ে আবার ফিরে তাকালো। মধ্য বয়সী লোকটা তার পিছনের লোকটার সাথে মুখ চাওয়া- চাওয়ি করলো। মানেটা স্পষ্ট। মেয়েটা কেনো এলো না; আমাদের সবার চোখে- মুখে এই প্রশ্ন। কেউ কেউ ভ্রু কুচকালো। মনে মনে হয়তো বললো- ভিজো, যতো খুশি ভিজো!

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটা ভিজে একেবারে জুবুথুবু। তারপরও সে ভিতরে এলো না। আট- দশ হাত দূর থেকে তার শরীরের পিছনের অংশটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটু আগে যে ঘুরে তাকিয়েছিলো, তখন মুখটা একবার দেখেছিলাম। তাতে মনে হয়েছে বয়সটা মেরেকেটে কুড়ি বা একুশের বেশি হবে না। এই বয়সের মেয়েছেলেদের বৃষ্টিতে ভয় থাকে না। কিন্তু নোভার ছিলো। বৃষ্টি দেখলেও ওর ঠাণ্ডা লেগে যেতো। কণ্ঠটা গুনগুন করতো। নোভার গুনগুন করা কণ্ঠের চেয়ে পৃথিবীতে মধুর কোনো কণ্ঠ হতে পারে না। সতের বছর আগে আমার ভাবনা এমনই ছিলো।

এখনো তাই ভাবি। কিন্তু ওই ভাবনাটা এখন আমাকে খুব বিব্রত করে। নোভা একটা সময় আমার যতোটা চেনা ছিলো, এখন ততোটাই অচেনা। একজন অচেনা মানুষের কণ্ঠে মধু না বিষ, তা নিয়ে কেউ ভাবে না। আমারও ভাবতে ইচ্ছে করে না। অথচ একটা সময় মনে হতো ও কখনো আমার অচেনা হবে না। কিন্তু সত্য কখনো কখনো বড় কঠিন। সত্যের সেই কঠিনতা আমি দেখেছি। দেখেছি বলেই নোভা আমার স্মৃতিতে এখন আসে না। একটা সময় প্রচুর ভাবতাম ওর কথা। ভাবার মতো বিশেষ কিছু ছিলো না। একটা কথাই বারবার মনে হতো- ও আমার সাথে এমন করতে পারলো?

বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি আর কোনো দিন থামবে না। অনন্তকাল ধরে বৃষ্টি পড়তে থাকবে। আমরাও অনন্তকাল এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো। এখানেই আমাদের বয়স বাড়বে। আমরা বুড়ো হবো। কেউ কেউ এখানেই মরে যাবো। মরে এই বৃষ্টির পানিতেই ভেসে যাবো। ভেসে ভেসে বঙ্গোপসাগরে চলে যাবো। সেখান থেকে আরেকটা সাগরে। তারপর আরেকটা সাগরে। তবুও বৃষ্টি আর থামবে না। এই বৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীতেই বৃষ্টি হচ্ছে।

যদিও আসলে তা নয়। সায়েদাবাদে যতোই বৃষ্টি হোক। মিরপুরে এখন বৃষ্টি হচ্ছে না। আমি যতোটা নিশ্চিত করে কথাটা বলছি, মিরপুরে বৃষ্টি না হওয়া নিয়ে আমি ঠিক ততোটাই নিশ্চিত। এর আগেও আমি দেখেছি যে পান্থপথ বা কাঁঠালবাগান- কলাবাগান বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমি মিরপুরের বাসে চেপেছি। মিরপুর পৌঁছে দেখি আকাশটা ঝলমলে! মিরপুরের আকাশ দেখে মনে হতো এই আকাশ আর যাই হোক বৃষ্টি ঝড়াতে পারে না।

মাঝে মাঝে আকাশ খুব মেঘলা দেখলে আমার মিরপুর চলে যেতে ইচ্ছে করে। মেঘলা আকাশ দেখার পর পর ঝলমলে নীল আকাশ দেখলে নাকি ভাগ্যে নতুন কিছু প্রাপ্তির সম্ভাবনা জাগে। নোভা একদিন আমাকে বলেছিলো সেই কথা। উত্তরে আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম, ঠিকই বলেছো। এ কারণেই তো আমি তোমাকে পেয়েছি। চাইলেই তোমার হাত ধরতে পারছি। তোমার আঙুল ধরতে পারছি। আমি মেঘলা আকাশ দেখার পর প্রতিদিন ঝলমলে আকাশ দেখতে চাই। মিরপুরের আকাশ যে কেনো ওই রকম অদ্ভুত ছিলো কে জানে।

আপাতত অবশ্য মিরপুরের আকাশের চেয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা মেয়েটাকে আমার বেশি অদ্ভুত মনে হচ্ছে। এতোক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজার পর আজ রাতে তার জ্বর না এসে পারেই না। এতোক্ষণ ভিজলে তো পাথরও কিছুটা ক্ষয় হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটার কিছুই হচ্ছে না? সে পাথরের চেয়েও শক্ত! কিছুক্ষণ আগে তাকে এখানে আসার সুযোগ দেয়া হয়েছিলো। সে আসেনি। হয়তো এ কারণেই মেয়েটার দিকে কেউ এখন আর মনোযোগ দিয়ে দেখছে না। তার জামার পিছনের অংশটা খুব বিশ্রিভাবে শরীরের সাথে লেগে গেছে। আমাদের মধ্যে কয়েকজন বেশ মনোযোগ দিয়ে তা দেখেছে। কিন্তু আশপাশের লোকজনের কারণে কেউ বেশিক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকেনি। তবে মনে মনে যে সবাই মেয়েটার গায়ের সাথে তার ভেজা জামার মতোই লেপ্টে থাকতে চাচ্ছে, তা নিশ্চিত। এবং এটাই স্বাভাবিক।

সভ্য আর অসভ্য মানুষের পার্থক্যের কথা বলতে গিয়ে অনেকেই বলবে, মেয়েটার দিকে তাকানোটাই অসভ্যতা। আমি কিন্তু তা বলবো না। আমার মনে হয় মেয়েটাকে কোনোভাবে আক্রমণ করা অসভ্যতা। তার দেহশৈষ্ঠব দেখা কখনোই অসভ্যতা নয়। তার দিকে না তাকানোটাই একটু কেমন কেমন ঠেকবে। এত্তগুলো পুরুষ মানুষ একসাথে নিশ্চয় পুরুষত্ব হারাতে পারে না।

মেয়েটার এ নিয়ে কোনো ভাবনা আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সে এক দুইবার তার জামা টেনে পিছনের অংশ থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিছুক্ষণ ধরে সেটাও করছে না। তার দুই হাতে দুইটা ব্যাগ। মেয়েটা এই মুহূর্তে হয়তো আরো একটা হাতের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। আমার মাঝে মাঝে এমন হয়। অফিস থেকে ফেরার সময় এক হাতে ব্যাগ থাকে। আরেক হাতে জুতা থাকে। রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে চাবি বের করতে গিয়ে আমি আরো একটা হাত গজিয়ে না উঠার জন্য আফসোস করি!

মেয়েটার অবশ্য একটা না, কয়েক মিনিট পর দুই দুইটা হাত গজিয়ে উঠলো। তারই বয়সী একটা ছেলে দৌড়ে এসেছে তার কাছে। এসেই একটা ব্যাগ নিজের হাতে নিয়েছে। মেয়েটা অবশ্য ব্যাগটা দিতে চায়নি। ছেলেটা এক রকম জোর করেই ব্যাগটা তার হাতে নিয়েছে। দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে মান- অভিমান পর্ব। ছেলেটা বোকার মতো ব্যাগটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক ওদিক যাওয়ার জন্য ওদের দুজনের মাঝে কোনো তাড়াই দেখা যাচ্ছে না। দূর থেকে আমি ওদেরকে দেখছি আর আমার শ্বাস প্রশ্বাস গাঢ় হয়ে উঠছে। সতের বছর আগে ঠিক এ রকম কিছুই কি হয়েছিলো আমার আর নোভার?

সে দিন আমি কিছুক্ষণ একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থেকে দূরে ছিলাম। কিন্তু দুই চোখ খুঁজে ফিরছিলো নোভাকে। পরে ভিজতে ভিজতে ওকে খুঁজে বের করে যখন ওর হাতের ব্যাগ নিতে চেয়েছিলাম ও এমন করেই হাতঝাড়া দিয়ে আমাকে রাগ দেখিয়েছিলো। আমি এই ছেলেটার মতো বোকা হয়ে যাইনি তখন। নোভার হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম বৃষ্টিতে ভিজলে ওর কী কষ্টটাই না হয়। পরে নোভা বলেছিলো, ওই টান মেরে ওকে নিয়ে যাওয়াটা নাকি ওর কাছে খুব ভালো লেগেছিলো।

আমি আনমনে এই ছেলেটার কাছেও তেমন কিছু আশা করছি। যদিও এই মেয়েটার বৃষ্টিতে ভিজলে নোভার মতো কষ্ট হয় কিনা জানি না। হলেও ছেলেটা তা জানে কিনা তাও জানি না। এখনকার প্রেমিক- প্রেমিকারা কেমন যেনো। কেউ কারো ভিতরে ঢুকতে চায় না। অথচ আমাদের সময় প্রেমিকরা প্রেমিকার পছন্দ- অপছন্দের সব খবর রাখতাম। নোভাকে দেখেছিলাম আমার ভালো লাগা খাবারের একটা তালিকা করে রেখেছিলো। বাসায় অবসরে সেই খাবার ও রান্না করা শিখতো। ওর খুব শখ ছিলো আমার প্রিয় খাবারগুলো শুধু ওই রান্না করে খাওয়াবে।

আমি জানি না, শেষ পর্যন্ত ও কতোগুলো খাবার রান্না করা শিখেছিলো। যেগুলো শিখেছিলো, সেগুলো কি ও এখন রান্না করে? রান্না করলে কাকে খাওয়ায়? নাকি ওর নতুন মানুষের পছন্দের তালিকায় আমার খাবারগুলো নেই? কে জানে! হঠাৎ করেই আমার চোখ ভিজে উঠছিলো। সতের বছর আগের নোভার মুখটা স্পষ্ট ভেসে উঠছিলো আমার চোখের সামনে।

এর মধ্যেই কাকতালীয় ঘটনাটা ঘটে গেলো। ছেলেটা একটু দেরিতে হলেও মেয়েটাকে টান মেরে নিয়ে যেতে লাগলো। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে দুজনকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখতে গেলাম ওরা কোন দিকে যাচ্ছে! দুজন লোক একসাথে কী হলো কী হলো বলে চেঁচিয়ে উঠায় ধ্যান ভাঙলো আমার। দুই পা পিছিয়ে আগের জায়গায় এসে দাঁড়ালাম আমি।

বৃষ্টি তখনও পড়েই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি কোনো দিন থামবে না। মনে হচ্ছে সারা পৃথিবীতে একযোগে বৃষ্টি হচ্ছে আজ। বৃষ্টি দেখতে দেখতে নোভার কথা মনে পড়তে লাগলো খুব। বুকের ভিতরে ওকে বলার জন্য কতো যে কথা জমে আছে আমার, কতো যে অভিমান পুষে চলছি প্রতিনিয়ত; আজ নিজের কাছেই সব বলতে ইচ্ছে করছে। নোভা কোথায় আছে, কেমন আছে- কিছুই আমি জানি না। জমিয়ে রাখা কথার একটাও ওকে কোনোদিন বলা হবে না।

এই বৃষ্টির মধ্যে নোভা কিভাবে কিভাবে যেনো ফিরে এলো আমার স্মৃতিতে। সত্যিই যদি নোভা ফিরে আসে, সত্যিই যদি অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কিছু না থাকে; তবে কী হবে? নোভা ফিরে এলে আমি কী করবো? আমার মনে এই প্রশ্নগুলো যখন তোলপাড় করছে, তখন বৃষ্টি ভেজা মেয়েটি ও ছেলেটি আমার চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু বৃষ্টির আর থামার নাম নেই। চলছে তো চলছেই।

Leave a Reply