পুরোনো প্রেমিকা, সিলেটের সিএনজি এবং অন্যান্য কথকতা

জ্যাম, ধুলো এবং বহু মানুষের শহর ঢাকা থেকে সিলেটে এসে চারটা দিন পার করার পর, একজন ঢাকাবাসী সবার আগে যে আরামটা পাবে সেটা আসবে শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায়। সিলেটের সবুজের সমারোহ থেকে উৎপন্ন হওয়া অক্সিজেনে মিশতে পারে না আর কোনো জটিলতা। ফলে শ্বাসতন্ত্রে অনুভূত হয় একটা আরামদায়ক ব্যাপার।

সেই আরামটা অবশ্য নামতে থাকা শীতের সময়ে ব্যহত হতে বাধ্য। এই রকম আরাম এবং তা ব্যহত হওয়ার সময়ে কোনো রকম মৌসুমের ধার না-ধারা পুরোনো প্রেমিকার স্মৃতিরা ভিড়তে থাকে কাছাকাছি এবং তা সব সময়ের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই নিয়মিত ব্যাপার। কখনো কখনো এমন হয়, শীত বাড়তে থাকার সময়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কিন্তু প্রেমিকার স্মৃতিরা প্রায় বিনাকষ্টে হাজির হয়ে যায়।

তাদের হাজির হওয়ার জায়গারা দৃশ্যমান হয় একেক সময় একেক রকম বর্ণ ও রূপ নিয়ে। যেমন সিলেটের একটা সবুজ সিএনজি; গাছ-পাহাড় ও চা বাগানের সবুজের বাইরে এই যান্ত্রিক সবুজেও ভর করে স্মৃতিরা কিংবা যা আসলে স্মৃতিবিষয়ক অন্যান্য জটিলতা।

দুই
চন্দনের বয়স আমার মতোই। দুই এক বছর বেশি হতে পারে। কিন্তু তাকে আসলে দেখায় আমার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী। তার চোখের নিচে কালি জমে গেছে। তার গালে পড়ে গেছে বয়সী ভাঁজ। যে ভাঁজের আড়ালে আছে অনেক না জানা গল্প। অনেক না বলা কথা।

চন্দন সিলেটে সিএনজি চালায়। বয়সের চেয়ে বেশি বয়সী চন্দন ১২ বছর ধরে সিএনজির স্টেয়ারিং হ্যান্ডল ধরে আছে। তার উপর তাই প্রায় অনিঃশেষ ভরসা নিয়ে চলতে চলতে বলে ফেলা যায় কিছু কথা। যে সব কথায় থাকে কেবল যাপিত জীবনের গল্প। যা বেশির ভাগ সময় বলা হয় না।

দুই পাশের যে গ্রিলে ঢাকার সিএনজিতে বসে নিজেকে বন্দি বন্দি মনে হয়, সেই গ্রিল সিলেটে অনুপস্থিত। ফলে সুফি সাধক শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গনে নির্ভার উড়তে থাকা পায়রার ঝাঁকের মতো মুক্ত লাগে নিজেকে। এই রকম মুক্ত লাগার সময়ে প্রায় অবধারিত ব্যাপার হলো স্মৃতিতে ডুবে যাওয়া।

যে স্মৃতিতে ভরপুর বর্ষা আর ঢাকার পিচ ঢালা রাস্তার বহু চেষ্টায়ও শুকাতে না পারার ক্লান্তিকর মুহূর্ত। যেখানে স্মৃতির গা ভিজে যায় রাস্তা থেকে ছিটে আসা বৃষ্টির ছাঁটে আর সিএনজির শতছিন্ন ছাদের প্লাস্টিক বেয়ে নেমে আসে প্রশ্ন— আচ্ছা, সিএনজিতে এমন গ্রিল থাকে কেনো?

প্রেমিকার শ্বাসের ঘ্রাণের চেয়ে মুগ্ধকর কোনো এয়ারফ্রেশনার হয় না পৃথিবীতে, হয় না কোনো পারফিউম বা বডি স্প্রেও। সেই মুগ্ধতা কোনো ক্ষতির মুখে পড়ে না সিএনজির ভিতরেও। স্মৃতিতেও সেই নেশা, সেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। শ্বাসের ঘ্রাণ ছড়িয়ে প্রেমিকা বলে ওঠে—

ঢাকায় তো অনেক জ্যাম। সিএনজির থেমে থাকার সুযোগে তুমি যদি ভাড়া নিয়ে চুপচাপ নেমে পড়ো! এ কারণেই এই গ্রিল। খুলতে গেলে আগে ড্রাইভারকে ডাকতে হবে তোমার !

তিন
স্মৃতির আচরণ বড় অদ্ভুত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার অর্ধেক জীবনে এ নিয়ে কয়েকটি লাইনে বলেছেন, এক মামা না মেসোমশাইয়ের চেহারা নাকি কখনো মনে থাকতো না তাঁর। অথচ বাজারের এক মুচির চেহারা তিনি ভুলতে পারেননি বহু বছর পরেও।

স্মৃতিরা আসলেই অদ্ভুত। কখন যে কী মনে রাখবে, আর কখন যে কী ডিলিট করে দিবে, তার কোনোই আভাস থাকে না কোথাও। পুরোনো প্রেমিকা মানেই নানা রঙের স্মৃতির হাহাকার। সেই স্মৃতিতে একটা সবুজ সিএনজি কিভাবে যে ফিরে আসে বারবার! স্মৃতিরা অদ্ভুত আসলে।

এই অদ্ভুতুরে জগতে ঢুকে গেলো বিপিএল ২০১৭; যখন প্রথমবার বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত এবং সম্ভবত সবচেয়ে সমালোচিত আসরের স্মৃতি জমলো সিলেটের মাটিতে। সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের প্রায় অনিন্দ্য সৌন্দর্য যাতে যোগ করে রাখছে মনে রাখার বাধ্যতা।

Leave a Reply