ফেরার কোনো গল্প নেই

এই প্রথম এতো কাছ থেকে শর্ষে ক্ষেত দেখছি আমি। গাঁয়ের মাটির গন্ধ শুঁকে শুঁকে হাঁটছি একেবারে অদেখা অথচ খুব চেনা পথ ধরে। জানিনা, ঠিক এ পথে তোমার পা পড়েছিলো কিনা কখনো। তবে আমি নিশ্চিত, এই শর্ষে ক্ষেতের পাশে এসে তুমি দাঁড়িয়েছিলে বহুবার। আমি জানি, এই গাঁয়ের বাতাসে তোমার শ্বাসের অস্তিত্ব আছে, আমি জানি- এই মাটির গন্ধ তোমার খুব চেনা। খুব ইচ্ছে ছিলো আমার, এই পথ ধরে এই শর্ষে ক্ষেতের পাশে এসে দাঁড়াবো তোমার সাথে। তোমার সোনা আঙুলের ফাঁকে আঙুল রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখবো দূর দিগন্তে আকাশ আর পৃথিবীর অদ্ভুত মেলবন্ধন। কিন্তু সময়ের অমোঘ সত্যের কাছে অস্তিত্ব হারিয়েছে আমার ইচ্ছে। পূরণ হয়নি একটুও। আমি জানি আমার জন্য স্রষ্টা কোনো ফেরার চিত্রনাট্য তৈরি করেননি। তাই ফেরার কোনো গল্পে আমি নায়ক হতে পারবো না। তোমাকেও পাবো না ফেরার গল্পের নায়িকা হিসেবে।

খুব কম সময়ে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে আমার। অচেনা হিসেবে মেনে নিতে হয়েছে চারপাশকে। তবুও আমি বেঁচে থাকছি আমার মতো। এই শর্ষে ক্ষেতের পাশে দাঁড়ানো তুমি-একটি ছবি আছে আমার কাছে। প্রতিদিন গভীর রাতে যখন নিয়ম করে ঘুম ভাঙে আমার, খুঁজে ফিরি তোমার শ্বাস নেওয়ার শব্দ; তখন ওই ছবিটা দেখি। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে অদ্ভুত এক শব্দ তৈরি হয় বুকে। পাঁজর ভেঙে পড়ে হয়তো! নিজের মতো বেঁচে থাকার এই এক সুবিধা- সবকিছুকে চিন্তা করা যায় নিজের মতো করেই।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সত্য হলো সময়। এই সময়ের ফেরেই তোমার ছোঁয়া থেকে ছিটকে পড়তে হয়েছে আমাকে। আবার এই সময়ের খেলায় মজেই আমি ছুটে এসেছি তোমার বেড়ে উঠার গাঁয়ে। সারাদিনের দমবন্ধ ব্যস্ততা শেষে তোমার কাছে ছুটে আসতাম। এখন সে সুযোগ নেই। ইট-কাঠ আর রড-পাথরের শহরে প্রাণ নেই। শ্বাস নেওয়ার বাতাস নেই। তাই বড় ইচ্ছে করছিলো তোমার কাছাকাছি আসতে। ইচ্ছে করছিলো তোমার শ্বাসের ঘ্রাণভরা বাতাসে বুক ভরে আরাম নিতেতাই ছুটে এসেছি তোমার গাঁয়ে। তোমার বেড়ে উঠার ধুলো-মাটিতে। নিজের মতো বাঁচতে চাওয়ার জীবনে এই-ই আমার বর্তমান। ফেরার কোনো গল্প নেই বলে বর্তমানকেই আঁকড়ে থাকছি এখন।
প্রেমিকদের চোখে পৃথিবীর তাবত সুন্দরের প্রতিনিধি কেবল প্রেমিকারা। এ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতেই আজকাল দেখি প্রেমিকদের বহুপ্রেমের বিলাস। আমি জানি, প্রেমিক হওয়ার সক্ষমতা নেই আমার। নেই বহুপ্রেম করার চৌড়া প্রেমিকমনও। তাই হাজারটা আকাশ দূরে তোমার চলে যাওয়ার পরও আমি একা। একাই সুন্দর। একা একা অলৌকিক এক ফেরার গল্পের অপেক্ষায় থাকি। ঠিক যেভাবে এখন একা এই শর্ষে ক্ষেতের হলুদ সৌন্দর্য দেখছি। যেভাবে উপভোগ করছি তোমার অদৃশ্য অথচ অনুভূতি ছোঁয়া অস্তিত্ব
তুমি নিজে কোনোদিন আমাকে এই গাঁয়ে ডেকে আনোনি। কতোবার আমি তোমার খালি পায়ে হাঁটার পথ দেখতে চেয়েছি, কতোবার চেয়েছি তোমার বাড়ির পুকুরে সাঁতার শিখতে। কিন্তু আমার চাওয়া কখনো মূল্য পায়নি তোমার কাছে। শহুরে দশজন প্রেমিকের সাথে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছো আমায়। অন্তর চোখ মেলে একটা বারও দেখোনি তোমার প্রতি সুতীব্র আকর্ষণ লালন করা মানুষটিকে। আমিও বোকার মতো দাঁড়িয়ে গেছি। কী বলছো তা না শুনেদেখেছি কথা বলার সময় একজন মানুষকে কতোটা সুন্দর দেখা যায়। ফেরার কোনো গল্প থাকলে, আবার তোমার কথা বলা দেখতে চাই। তুমি হাসলে মুগ্ধ হয়ে না দেখে, চোখ বন্ধ করে শুনতে চাই তোমার হাসির শব্দ। কিন্তু ফেরার যে কোনো গল্প নেই!
তোমার স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। অনুভূতির সবটুকু মনোযোগ দিয়ে দেখছি স্কুলে পড়া তোমাকে। দেখছি তোমার চারপাশ ঘিরে বেড়ে চলা ভিড়ের শুরুটা। স্কুলের কোন বারান্দায় তুমি দাঁড়াতে, স্কুল মাঠের কোন ঘাস সবচেয়ে বেশিবার তোমার ছোঁয়া পেয়েছেআমি জানি না। তবুও প্রতিটি বারান্দায়, মাঠের প্রতিটি ঘাসে ছড়িয়ে পড়ছে মন। প্রতিটি কুয়াশা বিন্দু তোমার নাম বলে কোরাস গাইছে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাই। তোমার শূন্যতা আমাকে যে গভীর বিরহের পথ দেখিয়েছে, সে পথে চলতে চলতে আমি হয়ে উঠেছি পৃথিবীর সবচেয়ে অনুভূতিপ্রবণ মানুষ। চোখ বন্ধ করলেও তাই সব দেখতে পারি আমি, নাক চেপে ধরেও পাই তোমার শরীরের আপন ঘ্রাণ। সজাগ অনুভূতি শক্তির সবটুকু দিয়ে তোমায় দেখছি। তোমার কিশোর প্রেমের চিত্র স্লো মোশন ছবির মতো ভেসে আসছে চোখের সীমায়। একজন একজন করে প্রেমিক জীবনের শুরুতেই টের পাচ্ছে বিরহ কাকে বলে। বেখেয়ালে ঈর্ষায় পুড়ছি আমি। কেনো এই গাঁয়ে জন্ম হয়নি আমার, অথবা কেনো সুযোগ আসেনি এই স্কুলের ইট ছোঁয়ার, কেনোই বা কিশোর প্রেমিকের সাথেই শেষ হয়ে যায়নি তোমার প্রেমের গল্প?
ফেরার কোনো গল্প না থাকলেও তোমার পায়ের ছাপ ফিরে আসে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠে তোমার বাড়ির পুকুর ঘাটে। এই পুকুরের ঘাট আর আগের মতো নেই। তুমি আমাকে যে রকম বলেছিলে, সে রকম নেই। ঘাস গজিয়ে বদলে গেছে আগের রূপটা। তারপরও এই ঘাট তোমার অস্তিত্ব ধারণ করে আছে সচেতনভাবেই। এই ঘাটে এসে এখন আর মন খারাপের ছবি আঁকো না তুমি। মনমরা কোনো সন্ধ্যায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়েও থাকো না। ঘাটের দিকে তাকিয়ে আমি তোমার না থাকার হাহাকার দেখতে পাই। প্রখর অনুভূতি শক্তি আমাকে নিয়ে যায় এই পুকুরে তোমার গোসল করার দৃশ্যে। তোমার হাতের নাড়ায় নড়ে উঠা পানির ফোঁটারা স্থির হয়ে গেছে এখন বাকি জনমেও যেনো আর নড়ে উঠবে না। আমি কাঠ দেখে গাছ চিনি না, তোমার বাড়ির পুকুর ঘাটে গাছের যে গোড়া আছে, এটিকেও চিনতে পারছি না। তবে সে গোড়ায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোমার সোনায় মোড়া পায়ের ছাপ। তোমার দীর্ঘকায় আঙুলের দাগ। বেখেয়ালে বেরিয়ে পড়ছে একেকটা দীর্ঘশ্বাস-এই পুকুর দেখতে সেই এলাম, যখন তুমি কেবল অনুভূতি। যাকে ধরা যায় না, যায় না ছোঁয়াও।
তোমার বাড়ির উঠোন দেখছি। শূন্য বাড়ি। কেউ নেই। কিন্তু খুব প্রিয় কিছু মানুষের গন্ধ জড়িয়ে আছে পুরো বাড়িতে। আমি এখানে আগন্তুক। বাড়িতে ঢুকে পড়তে মানা। ঢুকিও না আমি। কিন্তু সব দেখা হয়ে যায় তবু। তোমার হাতে দেওয়া মাটির প্রলেপ দেখছি, তোমার হাতের রেখা স্পষ্ট হয়ে আছে এখনো। ভালোবাসার সবচেয়ে বড় অর্জন মনে হয় এটিই-এই যে তোমার শ্বাসের ঘ্রাণ থেকে তোমার হাতের রেখা, সব চেনা আমার। মুখস্ত তোমার প্রতিটি ভাঁজ। ফেরার কোনো গল্প থাকলে, তোমাকে আমি তোমারই গল্প শোনাতাম। এই গাঁয়ে তুমি কতোটা ছড়িয়ে আছো, তা তোমাকে জানাতাম। কিন্তু ফেরার যে কোনো গল্প নেই!
সময়ের হেয়ালে তুমি এসে পড়েছিলে আমার কাছে। আমি স্থির হয়েছিলাম তোমার ঠোঁটের দাগে। জীবনের সৌন্দর্যে আমার মুগ্ধতার শেষ ছিলো না। মুগ্ধতার ঘোরে আমি ভুলে গিয়েছিলাম তোমাকে আগলে রাখার কথা। সময়ের হেয়ালি ভাবনায় তাই তুমি ছেড়ে গেলে সব মায়া, ছিঁড়ে দিলে কাছে আসার গল্প লেখার প্রতিটি পাতা। রঙিন বেলুন নিয়ে খেলতে থাকা শিশুর মতো আমি, বেলুন ফেটে যাবার পর চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে রইলাম শুধু। ছিন্ন বেলুনের দিকে। আমার শতছিন্ন ভালোবাসার দিকে। গভীর বুকের ঝড় পেরিয়ে একটা কথাও বের হতে পারেনি মুখ থেকে। তোমার ইচ্ছে মতো কেবল ছিটকে গেছি যোজন যোজন দূরত্বে। হয়ে গেছি অচেনার চেয়েও বেশি অচেনা।

ফিরে আসার কোনো গল্প নেই, তবুও আমাকে ফিরতে হবে শহরে। শহুরে পোকা হয়ে বাঁচতে হবে নিজের মতো। নিকোটিনের কড়া গন্ধ পাওয়ার বদলে বিসর্জন দিতে হবে তোমার শ্বাসের ঘ্রাণ। তোমার গাঁয়ের মায়া ছাড়তে পারবো না। ফেরার কোনো গল্প নেই, তবুও এ গাঁয়ে আবার ফিরবো আমি। কোনো একদিন হয়তো জন্ম নিবে একটা ফেরার গল্প। যে গল্পের এক ও একমাত্র নায়িকা হবে তুমি। হয়তো শর্ষে ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে আমার মুঠোর ভেতরে হাত রেখে বলবে, শায়ের, একটা ফেরার গল্প লেখো। আমি শুরু করবো গল্প লেখা। যদিও ফেরার কোনো গল্প হয় না।

Leave a Reply