বোলারদের দোষ দিয়ে কী লাভ?

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ দলের যে সকরুণ পরিস্থিতি, এর জন্য কার দোষ দিবেন আপনি? বোলারদের? হ্যা, দেয়া যায়। ব্যাটসম্যানদের? হ্যা, তাও তো দেয়া যায়।

ব্যাটসম্যানদের আলাপে পরে আসা যাক। আগে বোলারদের কথা ধরি। আচ্ছা, এই যে আমরা কথায় কথায় বোলারদের দোষ ধরছি, তাতে লাভটা কী হচ্ছে? বোলারদের দোষ দিয়ে আদতে কোনো লাভ নেই। বাংলাদেশের যে সিস্টেম বেয়ে এই বোলাররা জাতীয় দলে এসেছেন, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দিয়েছেন, ভয়াবহ রকম গলদ আসলে পড়ে আছে সেই সিস্টেমে।

জাতীয় দলের পেস আক্রমণের দিকে তাকানো যাক। শফিউল ইসলাম, রুবেল হোসেন, তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান এবং মাশরাফি বিন মর্তুজা। এদের মধ্য থেকে আমরা মাশরাফির আলাপটা বাদ দেই। ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে থাকা অধিনায়ক তার সামর্থ্য অনুযায়ীই পারফর্ম করছেন। সুতরাং বোলার মাশরাফি বিষয়ক আলোচনা বাদ।

বাকি চারজনকে আমরা একটু বিশ্লেষণ করি। শফিউল ইসলাম জাতীয় দলে এসেছিলেন ঘরোয়া পর্যায়ে খুব ভালো পারফর্ম করে। রুবেল হোসেন লাইমলাইটে আসেন পেসার হান্টের মাধ্যমে। তাসকিন-মোস্তাফিজরা ওঠে আসেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে আলো ছড়িয়ে।

এই যে জাতীয় দলে ওঠার সিঁড়ি— ঘরোয়া পর্যায়ে পারফর্ম বা বয়সভিত্তিক দল থেকে আলোর মশাল বয়ে চলা; এই পথে বর্তমানে কয়জন পেসার করছেন? জাতীয় দল বা এর খুব কাছে থাকা পেসারদের ছাড়া আর কোনো পেসারের নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছেন?

ঘরোয়া পর্যায়ে দীর্ঘ পরিসরের সেরা ক্রিকেট আসর ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগ। এই লিগে গত তিন বছরের পারফর্ম বিবেচনা করে যদি পাঁচজন করে বোলার বেছে নেন, তবে সেখানে পেসার পাবেন মাত্র তিনজন! এর মধ্যে দুজন আবার আল আমিন হোসেন ও ফরহাদ রেজা। অন্যজন হলেন আবু জায়েদ রাহি।

ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন? দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে আমরা যে পেসারদের পারফর্ম্যান্সের এতো সমালোচনা করছি, তাদের বোধবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছি— কেনো তুলছি? যে লোকটা পাঁচ কেজি ওজনের বোঝা বহনে সক্ষম নন, তার কাঁধে কিভাবে আমরা ৫০ কেজি তুলে দিয়ে সফলতা আশা করছি!

গত তিন বছরের ন্যাশনাল লিগের কথা বলছিলাম। স্ট্যাটস খুঁজলে দেখবেন, গত তিন বছরের মধ্যে গত বছর ছাড়া, আগের দুই বছরে সেরা পাঁচ বোলারের মধ্যে পেসার একজনও নেই! মানে তিন বছরের ১৫ জন সেরা বোলারের মধ্যে পেসার মাত্র গত বছরের তিনজন।

এই যে নতুন কোনো পেসার উঠে আসছে না, এই নিয়ে বিসিবির সে রকম কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি। বিসিবির পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান গত বছর স্পিনার খোঁজার একটি আয়োজন করেছিলো, সেই আয়োজন থেকে স্টানিং কোনো পারফর্মার উঠে আসেনি। ঘরোয়া পর্যায়ে ভুরি ভুরি স্পিনার থাকলেও বিসিবি পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের সুযোগ করে দিয়ে তাদেরকে দিলো স্পিনার খোঁজারই দায়িত্ব! পেসার খোঁজারও একটা উদ্যোগ অবশ্য ছিলো, কিন্তু তা থেকে বলার মতো তেমন কোনো ফল আসেনি।

দেশের ক্রিকেট যে একদল পেসারের জন্য তীর্থের কাকের চেয়েও বেশি আকুলতা নিয়ে বসে আছে, বিসিবির যেনো সে দিকে কোনো খোঁজই নেই।

তরুণদের গড়ে তোলার জন্য বিসিবির একটি উদ্যোগ আছে— হাইপারফর্ম্যান্স ইউনিট। এখানে যারা আছে, তাদের মধ্যেও তুমুল সম্ভাবনাময় কোনো পেসার নেই। বিসিবি পেলেপুষে যাদের ‘মানুষ’ করছে, তারা পেসার হিসেবে ভবিষ্যতে কতোদূর যেতে পারবেন, তা নিয়ে স্বয়ং বিসিবিও হয়তো সেভাবে আশাবাদী নয়।

তাহলে কি বাংলাদেশের পেস বোলিং প্রতিভাই নেই? প্রশ্নটা উঠে যাচ্ছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে এতো এতো আয়োজন হচ্ছে। ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগের বাইরে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ হচ্ছে, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ আছে, আছে বিপিএল। তারপরও তরুণ প্রতিভা কেনো উঠে আসছে না?

বাংলাদেশে যে পেস বোলিং প্রতিভা আছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই প্রতিভাদের লালন করার মানসিকতা নেই, নেই তাদেরকে মুক্ত ডানা মেলে উড়তে দেয়ার আকাশ— পেস বোলিং সহায়ক উইকেট।

ঘরোয়া ক্রিকেটে দিনের পর দিন খেলা হচ্ছে মৃতপ্রায় উইকেটে। প্রতি বছর লিগের আগে উইকেট নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। বিসিবি থেকে উইকেট বদলে ফেলার নানা রকম প্রতিশ্রুতি আসে। কিন্তু লিগ শেষে দেখা যায় পেসাররা আদতে কিছুই পায়নি।

গোড়ায় গণ্ডগোল রেখে মাথায় কোনোভাবেই সফলতা আশা করা যায় না। ঘরের মাঠে তাসকিন-মোস্তাফিজরা যতোই আলো ছড়ান না কেনো, তারা আসলে বিদেশের মাটিতে নিয়মিতভাবে আলো ছড়ানোর মতো দক্ষই হয়ে উঠতে পারেননি। পারেননি—? নাকি তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলার প্লাটফর্মই দেয়া যায়নি?

দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে এই পেসাররা দুই হাত ভরে রান দিয়ে যাচ্ছেন, এর জন্য আসলে তাদেরকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই। তাহলে দোষটা কাদের?

এই প্রশ্নের উত্তরে সম্প্রতি প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও সাবেক টেস্ট অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনের করা দুটি মন্তব্য সামনে নিয়ে আসা যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেই মিনহাজুল বলেছেন যে, পেসারদের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার অভাব আছে। এ কারণে তারা জানেনই না কোন জায়গায় বল ফেলতে হবে। আরো দক্ষ হওয়ার জন্য পেসারদের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন।

সুজন বলেছেন যে, পেসাররা নাকি নেটে চার-পাঁচ ওভার বোলিং করেই অনুশীলন শেষ করেন। অথচ ব্যাটসম্যানরা, তিনি এ ক্ষেত্রে মুশফিকুর রহিম ও তামিম ইকবালের নাম ধরে বলেছেন, এ দুজন মূল অনুশীলনের পরও ঘণ্টার ঘণ্টা নেটে বোলিং অনুশীলন করেন। যার ফল তো দেখাই যায়।

তো এই যে পেসাররা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার সুযোগ পান না বা অনুশীলনে চার-পাঁচ ওভার হাত ঘুরিয়ে দায়িত্ব সারেন; এর দায় কার? পেসাররা কোথায় প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলবেন বা তাদের অনুশীলনে কয় ওভার করে বল করতে হবে, এটা কে বলে দিবে?

যা হোক, দক্ষিণ আফ্রিকায় বোলারদের ব্যর্থতাটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটা অনুমিত এবং ভবিতব্য এক ব্যাপার। তাসকিন আহমেদ বা রুবেল হোসেন যদি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে একটাও উইকেট না পেয়ে দেশে ফিরতেন, অবাক হওয়ার কিছুই থাকতো না।

Leave a Reply