যাচ্ছি চলে…

আমার পকেটে এক টাকার একটা মাত্র আধুলি ছিলো। আর মানিব্যগের ভাজে ছিলো দুই টাকার ছেড়া তিনটা নোট। এই সাতটা টাকা নিয়ে পুরো একটা সপ্তাহ ধরে ঘুরে চলেছি। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করলে পুরো পৃথিবী আমার থেমে থাকে। সব অনুভূতি-শক্তি বিকল হয়ে পড়ে। ফলে খেতে ইচ্ছে করে না। অফিসে যেতে ইচ্ছে করে না। এমনকি ঘুমোতেও ইচ্ছে করে না। রাত নামলেই প্রচন্ড রাগ হয় স্রষ্টার প্রতি। আমার রাত এখন দরকার আছে নাকি! এমন যখন জীবন চলে তখন অর্থেরও খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না। সাতটা মাত্র টাকা নিয়েও পুরো সপ্তাহ কাটিয়ে দেওয়া কোনো কঠিন কিছু না। আমিও তাই খুব অনায়েসেই একটা পুরো সপ্তাহ কাটালাম।

সপ্তাহের শেষ দিনে এসে সিগারের নেশায় ধরলো খুব। সাত টাকা দিয়ে কয়টা সিগার পাওয়া যায়, হিসেব করতে মন চাইলো না। সংসারে মা-বাবা এখনো আছেন। মা পুরোপুরি সংসারমনা গৃহিনী। ৪৫ বছর ধরে বাবার সংসার সামলিয়ে যাচ্ছেন। এখন আমারটাও সামলাচ্ছেন। যদিও পৃত্থ্বীকে সামলাতে তার বেশ হিমশিমই খেতে হচ্ছে। এর জন্য যতোটা পৃত্থ্বীর দায়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি দায় আমার। ধারণাটা মা’র। আর বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলতে আমার দ্বীধা লাগে। ব্যবসা আবার ক্ষুদ্র হয় নাকি; সব ব্যবসাই বড়। দ্বীধা লাগার কারণ অবশ্য আমার এই বোধ নয়। বাবার যথেষ্ট মোটা ইনকামই এই দ্বীধার কারণ। সুতরাং পকেটে পড়ে থাকা সাত টাকার কথা আমার ভুলে গেলেও সমস্যা হয় না। মা’কে বললাম কিছু টাকা লাগবে।

অফিসে বেতন হয়েছে দিন তিনেক আগে, বেতনের টাকা কেনো নিয়ে আসছি না; ভেবেছিলাম মা জিজ্ঞেস করবেন হয়তো। করলেন না। পাচশো টাকার কড়কড়ে একটা নোট ধরিয়ে দিলেন তিনি। মা সম্ভবত বাবার কাছ থেকে চেয়ে টাকাটা দিলেন। টাকাটা নিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে নিচে নামার সময় বাবার কন্ঠে রাবিশ-অপদার্থ শব্দগুলো শুনে টের পেলাম বিষয়টা। পাত্তা দিলাম না। ইদানিং অবশ্য কিছুতেই পাত্তা দেই না আমি।

সিড়ি ভাঙতে ভাঙতে ভাবছিলাম পুরো পাচশো টাকার সিগার যদি খাই, কেমন হবে! এর আগে তো কখনো একদিনে এতো টাকার সিগার খাইনি। আজ যদি খেয়ে ফেলি কেমন হয়‍! নিজেরই খুব হাসি পেলো। কী ভাবছি এসব। পাগল টাগল হয়ে গেলাম নাকি আবার! নিজের ভাবনায় নিজেকেই পাগল ভেবে বসতাম না আমি; যদি ভাবনাটা ইচ্ছাকৃত হতো। এতো টাকার সিগার খাওয়ার ভাবনাটা অনিচ্ছাকৃত। পাত্তা দিলাম না। আমি পাগল; তবে আসল পাগল না। আমি নকল পাগল। আসল পাগলের সংজ্ঞা সবাই জানে। নকল পাগলের সংজ্ঞা হলো- যারা বউয়ের পাগল।

সিগার? সিগার আবার কি! দোকানদার এমন ভাবে কপাল কুচকালো, আমি সন্দেহে পড়ে গেলাম। আমি আসলে নাহিদই আছি তো! নাকি আফ্রিকার জঙ্গলের নাম না জানা কোনো অচেনা প্রাণী হয়ে গেছি। কী বলবো বুঝতে পারলাম না। আর বোঝার চেষ্টাটাও করলাম না। আবারো আগের কথাটাই বললাম দোকানদারকে। সে আবার বলে সিগার আবার কী ভাই? ওহ হো! নিজের মূল অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ ভাবনায় দোকানদার যে আমার কথাই বুঝতে পারেনি টের পাইনি। আদরের নাম সব জায়গায় বলা যায় না। আমিও তাই ডাক নামেই ডাকলাম প্রিয় সুইচকে।

০২
অফিসে না গিয়ে, বাসায় বসে থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত টেনে আনা কী যে কঠিন! ঘুম থেকে উঠেই দুপুর বারোটার অপেক্ষায় বসে ছিলাম। আর অপেক্ষায় বসে থাকা মানে যারপরনাই মানসিক চাপে থাকা। এই চাপটা চোখের সাধ্যের বাইরে থাকলেও হেলা করার কোনো উপায় নেই। অদৃশ্য এই চাপ না বলে কয়েই চ্যাপ্টা বানিয়ে ছাড়তে পারে। সেই ভয়েই চাপের সময়ে সিগারের হাত ধরি। ওহ হো! সিগারের তো হাত নেই। মাথা আর গোড়া আছে। কোনটা মাথা আর কোনটা গোড়া- এ নিয়ে সিগারক্লাবের বেশ কিছু মত আছে। সবগুলো মতই পরস্পর বিরোধী। বিরোধটা কোনটা মাথা আর কোনটা গোড়া এ নিয়ে কম হলেও; মাথা কেনো হলো বা গোড়া কেনো হলো এর বিশ্লেষণে গিয়ে লাগে।

পৃত্থ্বী আমার সাথেই থাকে। তিন বছর আগে পরিবারে না জানিয়েই বিয়ে করি আমরা। আড়াই বছরের মাথায় আমার বাসায় জানাজানি হয়ে যায়। বেশ বড় একটা ঝামেলা পেকে যায় তখন। আমাদের প্ল্যান ছিলো-আমরা কেউ কারো কাছ থেকে প্রতারণা আশা করি না। তবুও যে কারো প্রতারণা করার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং এই পথটা বন্ধ রাখতে হবে। প্ল্যানটা মূলত আমার না। পৃত্থ্বীর। আমারও পছন্দ হয়ে যাওয়ায় এটা আমাদেরই প্ল্যান। প্ল্যান মতো আমরা বিয়ে করলাম। পৃত্থ্বী হোস্টেলে থাকে। আমি বাসায়। দুই জন এক সঙ্গে থাকি হোটেলে। এভাবেই আড়াই বছর গেলো। ওর পরিবার থেকে জানলো আমাদের জাস্ট প্রেম। পৃত্থ্বীর কোর্স শেষ হলেই বিয়ে।

আড়াই বছর শেষে আমার বাড়ীতে জানার পর বাবা তার ছেলে বউ বাড়ীতে আনার জন্য পাগল হয়ে গেলেন! ভেবে রাখা ঝড় ঝাপ্টার কোনো আভাসই পেলাম না। মা’ও দেখি ফুপু-খালাদের দাওয়াত দিয়ে এনে আমার বিয়ের কথা বলছেন। সবাই খুব খুশি! কিচ্ছু বুঝলাম না আমি। ব্যাপার কি? সবাই কি আগে থেকেই ধারণা করে রেখেছিলো? সেটা মানা যেতো, যদি ব্যাপারটা শুধু বাবার সঙ্গে ঘটতো। কারণ তিনি সব সময়ই মনে করতেন এভাবে আমি “কিছু করেও” ফেলতে পারি। সুতরাং সবার ধারণা আগে থেকে ছিলো না। তবুও কেনো সবাই এতো খুশি বুঝতে পারা গেলো না। পৃত্থ্বীকে ব্যাপারটা জানাতেই সবার সঙ্গে আমিও যে একটু খুশি হয়েছিলাম, সেটুকু গেলো। গেলো তো জীবনের তরেই গেলো।

পৃত্থ্বীর প্ল্যানে ছিলো-ওর কোর্স শেষ হলে ওদের বাড়ীতে আমরা প্রস্তাব দিবো। আর সবাই যেহেতু আগে থেকে জানতে পারছে আমরা তিন বছর ধরে প্রেম করছি, সুতরাং সবাই মেনেও নিবে। তারপর আবার সামাজিকভাবে ধুমধাম করে বিয়ে। আমাদের বাসায় জানার পর পুরো বিষয়টা এলোমেলো হয়ে গেলো। বিশেষ করে বাবা পৃত্থ্বীকে বাড়ীতে নিয়ে আসার জন্য তাড়া দেয়াতে। আমি কী করবো ভেবে পেলাম না। আমি বাড়ীতে সব কথা বললাম। শুধু মা’কে। মা আস্তে আস্তে বাবাকে সব খুলে বললো। বাবাও রাজি হয়ে গেলো কোর্স শেষে ওদের বাসায় প্রস্তাব দেয়া হবে। তারপর সব প্ল্যান মতো।

পৃত্থ্বী জেনে খুশি হলো খুব। ও আমাদের বাড়িতেও আসলো। ওদের বাড়ির কেউ জানলো না। এভাবেই চলছিলো। হঠাৎ কী এক অজানা কারণে ওর আচরণ খুব উল্টাপাল্টা হয়ে গেলো। কোর্স শেষ হতে মাত্র তিনটা মাস বাকি। ও আমার সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিলো। আমাদের বাড়িতেও আসতে চাইতো না। হোটেল থাকবে না বলে দিলো। ওর হোস্টেলে দেখা করতে যেতে চাইলেও না করে দিলো। বুঝলাম না কী করা উচিত। আমি ওকে প্রচন্ড ভালোবাসি, তাই এভাবে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হলো না। আর বাসায় কারো সঙ্গে বিষয়টা শেয়ারও করলাম না। সবাই তাহলে পৃত্থ্বীকে ভুল বুঝবে। ও যতোটুকু ভুল, তারচেয়েও বেশি ভুল বুঝবে।

কোনো উপায় না পেয়ে আমি পৃত্থ্বীর ছোট খালার কাছে গেলাম। ভদ্র মহিলার সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিলো। গিয়ে সব খুলে বললাম। বিয়ের কথাটাও বাধ্য হয়ে বলতে হলো। খালাকে ভালো একটা সমাধান খুঁজে বের করার অনুরোধ করে চলে আসলাম। ওনি তখনই পৃত্থ্বীকে ওনার কাছে ডেকে পাঠালেন। সারারাত ওকে নানা মানসিক অত্যাচার করে “একটা ভালো সমাধান” খুজে বের করলেন। খালাকে জানানোয় পৃত্থ্বীও খুব রেগে গিয়েছিলো হয়তো। ওর খালা আমাকে ফোন করে বললেন, আমি যেনো ওকে ডিভোর্স দিয়ে দেই। উত্তর দেয়ার ভাষা পাইনি তখন। পরে পৃত্থ্বীর সঙ্গে কথা বললে সেও তা-ই জানায়। তখন বাড়িতে বিষয়টা জানানো ছাড়া উপায় ছিলো না। জানালাম। আমার চলে যাওয়া খুশি আর ফিরলো না। সব তালগুলিয়ে শেষ হয়ে গেলো।

০৩
বারোটা বেজে গেছে। পৃত্থ্বীর ক্লাস শেষ। ও এখন ফোন করে জানাবে ওর শেষ সিদ্ধান্ত। অনেক কান্নাকাটি এবং অনুরোধ করে “শেষ সিদ্ধান্তের” একটা সুযোগ চেয়েছিলাম আমি। সেই সিদ্ধান্ত জানাতে বারোটা বাজার পরই ও ফোন দিলো। আমি হ্যালো বলে পিক করলাম। ও বললো-
: এসএ পরিবহন যাও।
আমি বললাম-
: কেনো !
: ডিভোর্স লেটার পাঠাইছি। সাইন করে একটা কপি দিয়ো…
: কি!?
: এসএ পরিবহন যেতে বলছি…
: গেলে কিন্তু সাইন করেই দিবো…
ও শেষ কথাটা বললো-
: আরে! যাও…

ওর “যাও” শোনার পর আমি গেলাম এসএ পরিবহন। সাইন করে দিয়েও দিলাম। ডিভোর্স হয়ে গেলো। কিন্তু ও “যাও” বলে তো শুধু এসএ পরিবহন যেতে বলেছিলো। আর আমি তো যাচ্ছিই শুধু… কোথায় যাচ্ছি? তা জানি না। শুধু জানি চলে যাচ্ছি… চলে যাচ্ছি…

মূললেখাটা বন্ধুসভায়

Leave a Reply