সে যেভাবে আমার সাথে থাকে

আশুলিয়া, সাভার

শোনো, আমি তোমাকে আর একটাই কথা বলবো। প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। আমাকে আর জ্বালিয়ো না।

এই কথা বলে আব্বা আমাকে ধমকানো শুরু করলেন। আব্বা কতো দ্রুত তার একটা কথা শেষ করবেন, আমি সেই অপেক্ষায় রইলাম। লজ্জায় আমার শরীর অবস হয়ে আসছে। কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। কেউ একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালেই দেখতে পাওয়ার কথা।

আমি জানি না উপরের ঘর থেকে রুবা তাকিয়ে আছে কি না। তাকিয়ে থাকলে ও হয়তো আমার লাল হয়ে যাওয়া মুখটাও দেখতে পাচ্ছে। ও এই বাড়িতে আসার পর আমি আব্বার সামনে এইভাবে, যাকে বলে রামধোলাই, তা কখনো খাইনি। আজ খাচ্ছি। খেতে হচ্ছে এবং সেটা ওরই কারণে।

রুবা যদি উপরের ঘর থেকে আব্বা আমাকে কী কী বলছেন, তা শোনার চেষ্টা করে, তবে ওর দুইটা উপলব্ধি হবে। একটা ওর জন্য লজ্জার। আরেকটা আমার জন্য। একটা উপলব্ধি হলো, যেটা ওর জন্য লজ্জার— ও দেখবে ওর স্বামী এই বয়সেও বাবার সামনে কেমন ভয়ে কুকড়ে যায়।

আরেকটা ব্যাপার হলো, আমি যে অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়ে আব্বার কাছে ধরা খেয়ে গেছি, সেটা ও জেনে যাবে। যা ওর কাছে আমাকে চিরদিনের জন্য লজ্জিত করে দিবে। আমি জানি না, এই ঘটনা জানার পর ও আর আমার সাথে থাকবে কি না।

আমার জীবনের যতো মেয়েঘটিত ব্যাপার আছে, আব্বা সব একটা একটা করে বলা শুরু করলেন। কোন ঘটনা তার জন্য কেমন অপমানের হয়ে এসেছিলো,  সবিস্তারে বর্ণনা করতে লাগলেন সে ইতিহাসও।

আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছে, আব্বা ওইগুলো দয়া করে আর না বলেন। এখন যেটার জন্য ধরছেন, সেটা বলে বিদায় করে দেন। আমি মাফ চাই।

স্বাভাবিকভাবেই আমি এই কথাটা আব্বাকে বলতে পারলাম না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকাটাকেই মনে হলো একমাত্র উপযুক্ত কাজ। আমার দুই চোখ আমার পায়ের বুড়ো আঙুলে। খুব ইচ্ছা করছে মাথাটা উঁচু করে একটু উপরের দিকে তাকাই। দেখি রুবা আমাকে এই রকম অপদস্থ হতে দেখছে কি না। কিন্তু তাকাতে পারছি না। আব্বার সামনে এই মুহূর্তে মাথা উঁচু করে অন্য দিকে মনোযোগ দেয়ার স্পর্ধা আমার নেই।

নাদিয়ার সঙ্গে আমার ঝামেলাটার জন্য আব্বা কার কার কাছে অপমানিত হয়েছিলেন, তা তিনি বলতে শুরু করলেন। আমার প্রথম প্রেম ছিলো সে। আমি তাকে তুমি করে বলতাম। সে বলতো তুই করে। এক ক্লাসের ছিলাম দুজনে। তার তুই করে বলায় আমার খুব আপত্তি ছিলো। কিন্তু সে পাত্তা দিতো না।

নাদিয়ার মা আব্বার কাছে এসেছিলো বিচার নিয়ে। বলেছিলো, আপনার ছেলে ইমরান তো আমাদের মান- সম্মান কিছুই রাখলো না। বাচ্চা মেয়েটাকে সে কী বুঝিয়ে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে! আপনি একটু ব্যাপারটা দেখেন। আপনার ছেলেও তো বাচ্চা মানুষ। এতো এমন হলো কিভাবে?

আব্বা নাদিয়ার মার কথায় কোনো উত্তর দেননি। খুব লজ্জা পেয়েছিলেন। ভদ্রলোক হিসেবে দশ গ্রামের লোক আব্বাকে এক নামে চিনে। সেই তার ছেলে এক মেয়েকে পটিয়েছে, তার বিচার নিয়ে এসেছেন মেয়ের মা; ওই অপমানটা আব্বা ভুলতে পারেননি।

নাদিয়াজনিত ঝামেলার কথা শেষ করার পর আব্বার মনে পড়লো শিনুর কথা। মুন্সিগঞ্জের মেয়ে। আমাদের এলাকায় চাকরি করতো তার বাবা। তার সঙ্গে কিভাবে যেনো আমার একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিলো। সে ছিলো বয়সে আমার চেয়ে একটু বড়। একদিন বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। শিনুকে নিয়ে বাড়ির স্টেশন থেকে যেই বাসে উঠেছি, অমনি দেখি রাস্তার উল্টো পাশ থেকে আব্বা দৌড়ে আসছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে আমি প্রায় শিনুর ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকতে গেলাম। কেমন হলো— ভেবে জানলা দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে ইচ্ছে করলো একবার। কিন্তু করা হলো না কোনোটাই। এর মধ্যেই আব্বা উঠে পড়লেন আমাদের বাসটাতেই।

শিনু আব্বাকে চিনতো না। আমি সামনের সিটে হাতটা রেখে বসে ছিলাম। শিনু আমার হাতের উপর ঝুলিয়ে রেখেছিলো তার হাত। আব্বা এসে এইভাবে আমাকে দেখলেন। আমি আক্ষরিক অর্থেই মূর্তি হয়ে গেলাম। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলাম আব্বার দিকে। আব্বাও তখন বিভ্রান্ত। চোখে চোখ পড়ে গেছে, কী বলবেন বা কী করবেন, তা নিয়ে তিনিও তখন দ্বিধান্বিত। বললেন, ইমরান, কই যাও? এই তো সামনে। আমি বললাম।

আব্বা কখনো ডাকলে বা কিছু জিজ্ঞেস করলে, আমি উত্তর দেয়া শুরু করি ‘আব্বা’ বলে। সে দিন আব্বা বলতেও ভুলে গিয়েছিলাম এবং আব্বার ভয়েই!

নাদিয়া ও শিনুর স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে আব্বা কিছুক্ষণ ঝাড়লেন আমাকে। এরপর শুরু করলেন আজকের ঘটনাটা।

আজ সিনেপ্লেক্স থেকে বের হচ্ছি, সঙ্গে ছিলো ফারজানা। সে আমার প্রেমিকা নয়। কোনো দিন ছিলোও না। তারপরও এই মেয়ে আমার হাত ধরে হাঁটছিলো। তার হাত ধরাটায় প্রেমিকার হাত ধরার সঙ্গে মিল নেই। যদিও সে বোধহয় আমাকে পছন্দ করে এবং জানে, সে আমাকে পছন্দ করলেও আমি কোনোদিন তার পছন্দে সাড়া দিবো না।

সিনেপ্লেক্স থেকে বের হয়ে প্রথম এস্কেলেটরটা পেরিয়ে পড়লাম আব্বার সামনে। বিকেল সাড়ে চারটায় তিনি বসুন্ধরা সিটিতে কী করছিলেন, তা আমি জানি না। এবার আব্বা কিছু বললেন না। চোখে চোখ পড়ে গেছে। সরিয়ে নেয়ার উপায় নেই। আমি বললাম, আব্বা, হঠাৎ এখানে এলেন..! কী কাজে… আমাকে বললেই পারতেন। আব্বা বললেন, এমনিই। তোমার চাচার সঙ্গে এসেছি একটা কাজে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। আব্বার একপাশে ছোট চাচা দাঁড়িয়ে আছেন। তার দৃষ্টি ফারজানার দিকে।

২০ সেকেন্ডের দর্শনপর্বের পর আব্বা আমার নেমে আসা এস্কেলেটরে বিপরীতটা দিয়ে উপরে উঠে গেলেন। আমি ফারজানার সঙ্গে বাইরে এলাম। ভয়ে হয়তো কাঁপছিলামও। কিন্তু ফারজানাকে বুঝতে দিলাম না।

এই মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় রুবার মাধ্যমে। রুবার কলেজের বান্ধবী। কদিন আগে রুবা একে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো। তখন সে আমার ফোন নম্বরও নিয়ে গিয়েছিলো। একদিন ফোন করে বললো, আমার সঙ্গে একটা ছবি দেখতে চায়। বললাম ঠিক আছে। এরপর রুবাকেও নিয়ে এলাম একদিন। তিনজন মিলে সিনেপ্লেক্সে একটা ছবিও দেখলাম। রুবা যদি একে আমার সঙ্গে পরিচয় করে না দিতো, এই রকম কিছু হতো না।

আরো একদিন ফোন করে আমার সঙ্গে ছবি দেখার আবদার জানালো সে। দেখলাম। এরপর আরো একবার। সেই একবারটাই ঘটলো আজ। আজকে যে আমি ফারজানার ডাকে, তাকে নিয়ে ছবি দেখতে গেছি, এটা রুবা জানতো না।

এখন বোধহয় জেনে গেছে। আব্বা অন্তত আধঘণ্টা ধরে আমাকে বকে যাচ্ছেন। আর আমার প্রেমিকা, প্রায় প্রেমিকা ও অ-প্রেমিকা; যতো মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো, যাদের কথা আব্বা কিভাবে কিভাবে যেনো জেনে গিয়েছিলে

Leave a Reply