যেভাবে বিরাট ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে বিপিএল

চলছে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত এবং লাভজনক ঘরোয়া ক্রিকেট আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) পঞ্চম আসর। অর্ধ দশক ধরে বিপিএল আয়োজন হয়ে এলেও এই আসর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট আসলে সামগ্রিক বিবেচনায় লাভবান হয়নি তেমন। হ্যা, বিসিবির হয়তো অর্থযোগ ঘটেছে ভালোই, কিন্তু ক্রিকেটের উন্নতি মানে তো শুধু বিসিবির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থের ঝনঝনানি নয়; এর সঙ্গে থাকা দরকার ক্রিকেটীয় সফলতাও। সে দিক চিন্তা করলে বিপিএল এখনো বাংলাদেশকে সেভাবে কিছুই দেয়নি। তুলনায় নিয়েছে অনেক বেশি।

অথচ একটু চোখ-কান খোলা রেখে বিপিএলকে পরিণত করা যেতে পারে অনেক বড় ব্যাপারে। বিপিএল থেকে পাওয়া যেতে পারে দারুণ দারুণ রোমাঞ্চকর সব ক্রিকেট প্রতিভা। বিপিএলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নতুন রকম ক্রিকেট-সভ্যতা।

ক্রিকেট-সভ্যতা ব্যাপারটা আসলে ‘ডেভলপড’ হওয়া উচিত ছিলো ক্লাব পর্যায় থেকে। গত এক দশক আগে হয়তো তার কিছুটা ছিলোও। কিন্তু সেই সভ্যতা যখন আরো বিকশিত থাকার কথা, তখন আসলে তা পড়ে গেছে মুখ থুবড়ে। এখন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগকে কেন্দ্র করে যে ক্লাব-বিষয়ক ব্যাপার-স্যাপার আছে, তা আর যাই হোক বাংলাদেশ ক্রিকেটে অবদান রাখতে পারছে না। হ্যা, কথাটা প্রায় সিদ্ধান্তের মতো করেই বলা যায়।

লেখাটা শুরু হয়েছে— বিপিএল কিভাবে বিরাট ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে সে বিষয়ক আলোচনা দিয়ে। সে বিষয়ক আলোচনা হবে, তবে তার আগে কিছু কথা হোক ক্লাব বিষয়ক বিষয়ে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে যে কজন নতুন ক্রিকেটার সুযোগ পেয়েছেন, যাদের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছে, তাদের প্রায় কেউই কোনো ক্লাবের আবিষ্কার নন। বরং বিসিবির বয়সভিত্তিক পর্যায়ে যে তৎপরতা, তারই ফল হলেন বেশিরভাগ ক্রিকেটার। তাহলে বাংলাদেশের ক্লাবগুলো করছে কী আসলে?

খুব সম্ভবত এই প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর— না আছে কোনো ক্লাবের কাছে, না আছে ঢাকার ক্লাবগুলোর অভিভাবক সংস্থা ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিসের কাছে (সিসিডিএম)। শুনতে নির্মম লাগলেও, ব্যাপারটার বাস্তবতা শতভাগ।

দেশের ক্রিকেটে ক্লাবগুলোর অবদান যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখনই আলোর ফোয়ারা হয়ে উঠতে পারে বিপিএল। সেটা কিভাবে—? অনেকভাবেই হতে পারে। এ নিয়ে বিসিবি হয়তো চিন্তাভাবনাও করছে। ক্রিকেট সাংবাদিক হিসেবে কিছু চিন্তাভাবনা চলে আসছে আমার মাথায়ও।

কদিন আগে বিপিএল পরিচালনা পরিষদের সদস্য সচিব এবং বিসিবির প্রভাবশালী পরিচালক ইসমাঈল হায়দার মল্লিক বলেছেন যে, বিপিএলের বাইরে আরো একটি ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগের চিন্তা করছে বিসিবি। যেখানে কোনো বিদেশি খেলোয়াড় থাকবে না। কেবল দেশি খেলোয়াড়দের নিয়ে প্রস্তাবিত এই টুর্নামেন্টের চিন্তাটা অবশ্যই সাধুবাদের দাবিদার।

কিন্তু লক্ষ্যটা এখানে সুদূরপ্রসারী নয়। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, প্রস্তাবিত এই টুর্নামেন্টের ট্যাগ লাইন হলো— বিদেশিবিহীন বাংলাদেশি টি-টোয়েন্টি লিগ। কিন্তু বিদেশিবিহীন টুর্নামেন্ট আমাদের বেশি দরকার, নাকি দেশীয় প্রতিভার ছড়াছড়ি থাকবে; আমাদের এমন টুর্নামেন্ট দরকার?

অবশ্যই প্রতিভার খনিই আমরা চাই। কিন্তু শুধু বিদেশিদের না খেলানোর সিদ্ধান্তই কি প্রতিভার খনির সন্ধান দিবে? অবশ্যই দিবে না এবং সেটা সম্ভবও না।

কিন্তু প্রস্তাবিত ওই লিগটিই হতে পারে বিরাট ব্যাপার। এ জন্য বিপিএলের ফ্রেঞ্চাইজিগুলোকে নিয়েই ওই টুর্নামেন্ট করতে হবে। সেটা কিভাবে হবে— এবার হোক মূল আলোচনা।

বিপিএলের ফ্রেঞ্চাইজিরা ক্রিকেটকে পণ্য বানিয়ে নানা রকম ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জন করে। ক্রিকেট কেন্দ্র করে এই ব্যাবসা অবশ্যই ইতিবাচক ব্যাপার। কিন্তু ক্রিকেটের চেয়ে ব্যবসাটাই যখন এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন তা আর দেশের কাজে লাগে না। বরং ক্রিকেট কেবলই হয়ে থাকে ফ্রেঞ্চাইজিদের ব্যবসা প্রসারণের পথ।

এখন বিসিবিকে এমন একটা উদ্যোগ নিতে হবে, যেটাতে ফ্রেঞ্চাইজিদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং ক্রিকেটের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উন্নয়ন সাধন হবে। তো এটা করার জন্য ফ্রেঞ্চাইজি হতে চাওয়া বা টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী ব্যবসায়িক গোষ্ঠিগুলো বিসিবি শর্ত দিবে যে, তোমরা যদি বিপিএলের সাথে থাকতে চাও, তাহলে তোমাদের বিনিয়োগ করতে হবে ক্রিকেটের উন্নতির জন্য। বানাতে হবে সর্বাধুনিক সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন ক্রিকেট একাডেমি, যেখানে বছরজুড়ে চলবে ক্রিকেটার তৈরির কার্যক্রম।

এই সব একাডেমির একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিবে বিসিবি। একাডেমি থেকে উঠে আসা ক্রিকেটারদের নিয়ে তাদের বানাতে হবে প্রস্তাবিত টুর্নামেন্টের দল। এভাবে সাতটা ফ্রেঞ্চাইজি যদি সাতটা একাডেমি থেকে ক্রিকেটার বের করে আনে এবং তাদের নিয়ে টুর্নামেন্ট করে; তাহলে এই টুর্নামেন্ট থেকে এক ঝাঁক পারফর্মার পাওয়া মনে হয় না খুব কঠিন কিছু হবে।

পরে প্রস্তাবিত টুর্নামেন্টটির পারফর্মারদের সেরারা জায়গা পেয়ে যাবে তাদের নিজ নিজ ফ্রেঞ্চাইজির মূল বিপিএল দলে। তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে ফ্রেঞ্চাইজিরা। সব মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা হয়ে উঠতে পারে ক্রিকেটার তৈরির বিশাল এক কর্মযজ্ঞ।

কাজটা করে ফেলতে পারলে বিপিএলে দেশি পারফর্মারদের জন্য বাংলাদেশকে হাহাকার করতে হবে না। তখন বরং চোখ ধাঁধানো পারফর্মের মঞ্চ হয়ে উঠবে বিপিএল। দেশ-বিদেশের ক্রিকেট পাগল দর্শকরা সারা বছর উন্মুখ হয়ে থাকবে বিপিএলের জন্য। পরিস্থিতি যখন সত্যিই সে দিকে যাবে, স্পন্সররাও টাকার বস্তা নিয়ে হাজির হবে বিপিএলের ফ্রেঞ্চাইজিগুলোর কাছে। ভিড় করবে আন্তর্জাতিক বড় বড় ব্রান্ডও।

সেটা তো বোঝা গেলো। কিন্তু পুরো কাজটা করতে আসলে কী দরকার? কিছুই না। শুধু সদিচ্ছা এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রচেষ্টা ও বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা।

একটা পর্যায়ে গিয়ে বিপিএলই হয়ে উঠতে পারে ফ্রেঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেটের আদর্শ। আইপিএল, বিগব্যাশ বা এ ধরনের লিগগুলোতে দেখা যাবে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ছড়াছড়ি। তো ঠিক তখন জাতীয় দলটা কী পরিমাণ বিক্রমের ভাণ্ডার হতে পারে; সেটা বুঝতে নিশ্চয় বিশাল ক্রিকেটবোদ্ধা হওয়ার দরকার নেই!

Leave a Reply