পাতা ঝরার দিন যায়…

গাঁয়ের খোকা বলতে যা বোঝায়, আমি ঠিক তা নই। গাঁয়েই জন্ম যদিও। তারপরও গাঁয়ের খোকাদের মতো জেদ, মেধা, প্রজ্ঞা বা গাছগাছালি চেনার সহজাত ব্যাপারটা আমার মধ্যে নেই। ফলে যে পাতাটা অফিস যাওয়ার পথে মাথার উপরে এসে পড়লো, সেটা কোন গাছের, তা আমি বলতে পারছি না।

বছরে একবার করে পাতা ঝরার দিন আসে। যেমন এখন এসে গেছে এবং যাচ্ছে। আর স্মৃতির পথে কে যেনো ফুঁ দেয় এবং কিছু পাতা সরে যায় সেখান থেকে। স্মৃতির পথটা কেমন চকচকে হয়ে ওঠে। সেই পথ পেয়ে অনুভূতিরা দৌড়ে চলে যায় শৈশবে।

যেখানে এখনো সূর্যটা হেলে আছে পশ্চিম আকাশে। একটা দুইটা সাদা মেঘের ফালি ওড়াউড়ি করছে সূর্য ঘেসে আর পৃথিবীতে এসে যে রোদ ছড়িয়ে পড়ছে মরা ঘাসের উপর, তার একটু এসে মিশে যাচ্ছে আমার খালি পায়ে। আমি দৌড়ে চলছি প্রাণপণ। এক পা ওই দিকে তো দশ পা এই দিকে। এই রকম দিগ্বিদিক ছোটাছুটির শৈশব কেমন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে স্মৃতিতে।

আরো একটা পাতা পড়ে। নাক ছুঁয়ে উড়ে যায় অন্য দিকে। আমি মুহূর্ত কয়েক তাকিয়ে থাকি। এই পাতাটা ছুঁয়ে গাছের মৃত ডালে বসেছিলো একটা হলুদ পাখি। দূর দেশ থেকে আসা সেই পাখির স্পর্শ পেয়েই কি পাতাটা এ রকম হলুদাভ রং নিয়েছে? হতে পারে, এ রকম হয়ও বোধহয়।

এই সব পাতা ঝরার দিনে পায়ে আলতা মাখা এক কিশোরীকে দেখেছিলাম কবে যেনো। স্মৃতির পথ থেকে যেহেতু কিছু পাতা ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে কেউ, সেহেতু সেই কিশোরীর এক পা দুই পা এগোনোর দৃশ্যটা স্লো মোশন ছবির মতো ভেসে আসছে আর আমি হাঁটছি অফিসের দিকে।

সেই কিশোরীর পায়ের নখ বড় বড় ছিলো কি? স্মৃতির রহস্যলোকে অনেক কিছু স্পষ্ট হলেও কিছু ব্যাপার ঝাপসা থাকে। কিশোরীর পায়ের নখ এখন সেই ঝাপসা-রহস্যের মুখোশ পরেছে। ফলে মনে পড়ছে না কিছুই। জোর করে মনে করতে পারার ক্ষুরধার মস্তিষ্ক নেই আমার করঙ্গে। সুতরাং মনটাকে উড়িয়ে দেই অন্য দিকে। আর এ দিকে পাতা পড়তে থাকে একটা দুইটা করে।

এই সব দিনে কোন দিক থেকে যেনো বড় মন খারাপ করে দেয়া বাতাস আসতো। শরীর ছুঁয়ে চলে যেতো কোথায় যেনো। শৈশবের সেই সব দিনে আবহমণ্ডল নিয়ে দিকশূন্য ছিলাম। এখনো তাতে বদল আসেনি। আবহমণ্ডলের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে এখনো আগের অজ্ঞতা বয়ে চলছি। সেই সব বাতাসে ভর করে এলোমেলো সব চিন্তারা আসতো। আবার চলেও যেতো সব কিছু এলোমেলো করে দিয়ে।

পাতা ঝরার যে দিন যাচ্ছে এবং এই সব দিনে নানা রংয়ের স্মৃতিরা বহু পুরোনো ডায়েরির জীর্ণ পাতার প্রায় অস্পষ্ট লেখার মতো ফিরে আসছে। যেমন অফিসে যাওয়ার পথে আসলো এবং আসবে আরো। পাতা ঝরার দিন যায়, আর আমার মন কার জন্য যেনো কেমন হয়ে ওঠে…

Leave a Reply